বনানীতে স্পা কাণ্ডে প্রশাসনের নীরবতা
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর ২৭ নং রোডের একটি স্পা সেন্টারকে ঘিরে সম্প্রতি সংবাদ দিগন্তে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরও অভিযোগের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে| দীর্ঘদিন ধরে ওই স্পা সেন্টারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরলেও, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে অভিযোগগুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে কি না| দীর্ঘদিন ধরে শহিদ ও মিঠুর স্পা সেন্টারটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি| আরও পড়ুন: আলোচনা, সমালোচনা আর দায়িত্বের গল্প: ওসি দাউদসংবাদ দিগন্তের অনুসন্ধানে জানা যায়, স্পা সেন্টারটি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কপি, অভিযোগের সারসংক্ষেপ এবং কিছু তথ্য-উপাত্ত বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে পাঠানো হয়| একই সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়| সংবাদ দিগন্তের কাছে সংরক্ষিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের লিংক পাঠিয়ে ওসির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না| পরবর্তীতে আরও কয়েকবার বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য চাওয়া হয় এবং একাধিক ভয়েস কলও করা হয়| স্ক্রিনশট অনুযায়ী, কলগুলোর পাশে "No answer" প্রদর্শিত হয়েছে| প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বনানী থানার ওসি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়| পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়ে বক্তব্যও চাওয়া হয়| কিন্তু প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি| বনানীর ২৭ নং রোডে একটি স্পা সেন্টারকে ঘিরে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনের পর স্থানীয়দের একাংশ ও অভিযোগকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে| অনুসন্ধানে উঠে আসে স্পা ব্যবসায়ী শহিদ ও ওসির ঘনিষ্টতা এবং স্পার প্রতিমাসের টাকা ওসির পকেটে| যার ফলে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর কোন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি| এয়াড়া সংবাদ দিগন্ত পত্রিকার গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) নিকট সারসরি সাক্ষাত করেন ও তিনি ওসিকে নির্দেশ দিলেও সেটিকে উপেক্ষা করে নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেননি| আরও পড়ুন: গাজীপুরে লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম কার্যক্রমের অভিযোগএছাড়া বর্তমান বনানী থানার ওসি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম এর আগেও আলোচনায় এসেছিলেন| ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানায় কর্মরত অবস্থায় বদলির আদেশের পর থানার ব্যবহৃত এসি, টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফাসেট সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে| ওই সময় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হলে তাকে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়| তবে ওই ঘটনার চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা আইনি নিষ্পত্তি সম্পর্কে প্রকাশ্যে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি| তাই সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়| পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী সেই ফরিদুল এখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানার ওসি|আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট থানা বা সংস্থার উচিত দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, প্রাথমিক যাচাই এবং প্রয়োজনে তদন্ত করা| একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বক্তব্যও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া জরুরি|আরও পড়ুন: হামলা-হয়রানিতে চ্যালেঞ্জে পুলিশস্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বনানী যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, তাই এখানে যেকোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত| অভিযোগ সত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে জানানো দরকার| সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনআস্থা বজায় রাখতে হলে অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| কোনো অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য না পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা উচিত, পাশাপাশি পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য দিলে সেটিও প্রকাশ করা উচিত|আরও পড়ুন: পুলিশ সংস্কার কতদূর, কী ভাবছে সাধারণ মানুষ?অণ্যদিকে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার আগে পরিচয় জানতে চাইতে পারেন| যেমন: আপনি কোন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি?, আপনার নাম কী?, কোন বিষয়ে তথ্য জানতে চাইছেন? এসব প্রশ্ন স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গত হতে পারে| তবে একজন সাংবাদিক কোনো বিষয়ে তথ্য বা বক্তব্য চাইলে "আপনার লেখাপড়া কী?", আপনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য কি না?" আমার অনেক বন্ধু বান্ধব রয়েছে প্রেসক্লাবে” এ ধরনের প্রশ্ন সাধারণত তথ্য দেওয়ার আইনি পূর্বশর্ত নয়| বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করার জন্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলকও নয়| কোনো গণমাধ্যমের পরিচয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিত্বই মূল বিষয়| তবে অবৈধ স্পা বা হোটেলটের অপরাধ বিষয়ে আলোচনা করতেই তার চোঁখ উল্টে যায়|আরও পড়ুন: গুলশান পুলিশকে বিতর্কিত করতেই মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারএকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদ দিগন্তকে বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে| তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি| কোনো অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও সেটি তদন্তের একটি তথ্যসূত্র হতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই যাচাইকৃত তথ্য ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই হতে হবে|