দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

ভুল রিপোর্টে লামায় তোলপাড়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘিরে বিতর্ক

বান্দরবানের লামা এলাকায় অবস্থিত ‘শান্তিনিকেতন ডক্টরস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ ঘিরে সম্প্রতি সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। রোগ নির্ণয়ের নামে ভুল তথ্য প্রদান, পুরনো ও অকার্যকর যন্ত্রপাতি ব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং রোগীদের সাথে প্রতারণার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে দিন দিন। বিশেষ করে এক ভুক্তভোগী রোগী রুহুল কবিরের ভুল রিপোর্টকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সামনে আসে এবং তা দ্রুত সামাজিক ও গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রুহুল কবির নামের এক ব্যক্তি শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করলে চিকিৎসকের পরামর্শে উক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। তবে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তিনি মারাত্মক অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন। পরবর্তীতে অন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে একই পরীক্ষা করালে দেখা যায়, আগের রিপোর্ট সম্পূর্ণ ভুল ছিল। এতে করে রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।আরও পড়ুন, পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা মব কালচাররুহুল কবির জানান, আমি চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু যে রিপোর্ট দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল। পরে অন্য জায়গায় পরীক্ষা করে বুঝতে পারি আগের রিপোর্টে কোনো সত্যতা নেই। এতে আমার সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হয়েছে, পাশাপাশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছি। এ ঘটনার পর স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল হলে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেকে অভিযোগ করেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অনিয়ম চলছিল। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অভ্যন্তরীণ এক কর্মী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, এখানে ব্যবহৃত বেশিরভাগ মেশিনই পুরনো এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে কাজ করে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে। অনেক সময় দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার চাপ থাকে, তখন সঠিকভাবে পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট তৈরি করা হয়।এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মী আমতুল হাফিজ বলেন, রুহুল কবিরের রিপোর্টে ভুল হয়েছে, সেটা আমরা অস্বীকার করছি। তবে এটি ইচ্ছাকৃত নয়, অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ভুল। আমরা বিষয়টি সংশোধনের চেষ্টা করেছি এবং প্রয়োজনে টাকা ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, শুধু টাকা ফেরত দিলেই দায় এড়ানো যায় না। ভুল রিপোর্টের কারণে রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়তে পাওে এমন আশঙ্কা থেকেই তারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।আরও পড়ুন, আইনের শাসন না মবের রাজত্ব?প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিকাশ কলির বিরুদ্ধে রয়েছে আরো গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিগত আমলে স্বৈরাচারী আ.লীগের স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অনিয়ম চালিয়ে আসছেন। সাংবাদিকরা তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি নাকি অসহযোগিতামূলক আচরণ করেন এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।একাধিক সাংবাদিক জানান, আমরা যখন তার কাছে বিষয়টি জানতে চাই, তখন তিনি আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন এবং রিপোর্ট প্রকাশ না করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এমনকি হুমকিও দেন, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি স্বরূপ| এ ধরনের আচরণ প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বড় ধরনের অনিয়ম লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। তারা মনে করেন, নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে আরো ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তিনি আরো বলেন, আমার এখান থেকে অনেক সাংবাদিকরাই পয়সা নেয় মাসে মাসে। যাতে তার বিরুদ্ধে লেখার কেই সাহস না পায়। এদিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবহৃত অনেক মেশিনের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন বা নিয়মিত তদারকির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা সরাসরি স্বাস্থ্যখাতের নীতিমালার লঙ্ঘন।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট প্রদান। যদি সেখানে ভুল হয়, তাহলে পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। এতে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে আসছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন যখন বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে, তখন প্রশাসনের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।আরও পড়ুন, ছাত্রদলের ২৯ কমিটি ঘোষণাআরেক বাসিন্দা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমাদের এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত। তাই আমরা বাধ্য হয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু যদি সেখানেও প্রতারণা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাবো? এ ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই বিষয়টি জানলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে অনিয়মগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলতে পেরেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি টিম গঠন করা হতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এ ধরনের অনিয়ম বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল বা আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থের জন্য মারাত্মক হুমকি। তারা আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাত একটি সংবেদনশীল খাত। এখানে কোনো ধরনের অবহেলা বা প্রতারণা মেনে নেওয়া যায় না। তাই নিয়মিত মনিটরিং, লাইসেন্স যাচাই এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।আরও পড়ুন, হামের টিকাদান কর্মসূচি ৮১ শতাংশ সম্পন্ন : স্বাস্থ্যমন্ত্রীরুহুল কবিরের ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তারা মনে করছেন, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক মানুষ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হবেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় কয়েকটি সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকরা এ বিষয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পরিকল্পনা করছেন। তারা দাবি জানিয়েছেন উক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো, স্বাস্থ্যখাতের নামে প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি মানুষের জীবন নিয়ে সরাসরি খেলা। তাই সময় এসেছে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রোগী এমন ভোগান্তির শিকার না হন।লামার ‘শান্তিনিকেতন ডক্টরস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়, বরং সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

ভুল রিপোর্টে লামায় তোলপাড়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘিরে বিতর্ক