গুলশানে স্পা সেন্টারে অভিযান: মালিকসহ নারী সিন্ডিকেট গ্রেফতার ও মামলা প্রক্রিয়াধীন
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে স্পা সেন্টারের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলা কথিত অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে মালিকসহ একটি সংঘবদ্ধ নারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গুলশান থানার নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে কয়েকটি স্পা সেন্টার থেকে একাধিক ব্যক্তি আটক করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গুলশান এলাকার ৯৯ নম্বর রোডে অবস্থিত বাহার পরিচালিত একটি স্পা সেন্টার এবং গুলশান-২ এলাকার এইচ হোটেলে অবস্থিত রত্না পরিচালিত স্পা সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্পা ব্যবসার আড়ালে অসামাজিক কর্মকাণ্ড, দেহব্যবসা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ ছিল।স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের অভিযোগ, রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু স্পা সেন্টার স্বাস্থ্যসেবা বা সৌন্দর্যচর্চার নামে পরিচালিত হলেও এর আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ, নারী সরবরাহ এবং অর্থ লেনদেনের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।অভিযান প্রসঙ্গে গুলশান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাংবাদিকদের বলেন, “অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি আরো পড়ুন ,যুবদলের নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ, গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখসংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে স্পা সেন্টারের আড়ালে অসামাজিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধ করে আসছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি সাংবাদিকরা তথ্য দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করেছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং উক্ত বিষয়টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।পুলিশের এ বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ দমনে সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে।তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অভিযানের আগে বেশ কিছুদিন ধরে সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি চালানো হয়। বিভিন্ন অভিযোগ, তথ্য ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযানের সময় স্পা সেন্টারগুলোতে কর্মরত কয়েকজন নারী, ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয় অভিযানে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন নথি, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তদন্তকারীরা এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।স্থানীয়দের অভিযোগ, গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগের জন্ম দিলেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। অনেক সময় সাধারণ মানুষ অভিযোগ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এই অভিযানের ফলে এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বিভিন্ন কথা শুনে আসছিলাম। গভীর রাত পর্যন্ত সন্দেহজনক লোকজনের যাতায়াত ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ ধরনের অভিযান নিয়মিত হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।”সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্পা, ম্যাসাজ পার্লার ও ওয়েলনেস সেন্টারের নামে বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠান অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সময়ে সময়েই অভিযান পরিচালনা করা হলেও নতুন নামে বা নতুন স্থানে আবারও কার্যক্রম শুরু করার অভিযোগ রয়েছে। ফলে আরো পড়ুন , কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণস্থায়ীভাবে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর জীবনে স্পা ও ওয়েলনেস সেবা একটি বৈধ ও প্রয়োজনীয় খাত। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ খাতকে ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় পুরো শিল্পখাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই বৈধ প্রতিষ্ঠান ও অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।গণমাধ্যমকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্পা সেন্টারের আড়ালে পরিচালিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছিল। এসব প্রতিবেদনের পর প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধি পায় এবং সাম্প্রতিক অভিযানের পথ সুগম হয়। তারা মনে করেন, জনস্বার্থে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অব্যাহত থাকলে সমাজের বিভিন্ন অপরাধচক্র চিহ্নিত করা সহজ হবে।অভিযানের পর গুলশান এলাকায় অন্যান্য স্পা সেন্টারেও সতর্কতা দেখা গেছে বলে জানা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের লাইসেন্স, কার্যক্রম ও কর্মীদের তথ্য হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিয়মিত তদারকির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, আলামত বিশ্লেষণ এবং তথ্য যাচাই শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে এ চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তি বা সহযোগীদের শনাক্ত করার কাজও চলছে।সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, রাজধানীতে অপরাধ দমনে অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত তদারকি এবং তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার সমন্বয় প্রয়োজন। তাহলেই স্পা সেন্টার বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সংঘটিত অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।