দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

কোন্দলের আগুনে পুড়ছে রাজনীতি

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোন্দল যেন একটি স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে| ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী জোট কিংবা ছোট রাজনৈতিক দল প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের বিরোধ, মতপার্থক্য এবং প্রকাশ্য সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে| এর ফলে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ যেমন অস্থির হয়ে উঠছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের ˆদনন্দিন জীবনে| রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতবিরোধ থাকাটা স্বাভাবিক| বরং মতের বহুমাত্রিকতা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ| তবে যখন সেই মতবিরোধ সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে সংঘাত, বিভাজন কিংবা সহিংসতার দিকে ধাবিত হয়, তখন সেটি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়| বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই চিত্রই স্পষ্ট হয়ে উঠছে|আরো পড়ুন: নতুন সরকারের প্রথম একনেক বৈঠক ৬ প্রকল্প অনুমোদনবিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এখন আর গোপন থাকছে না| দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পদবণ্টন, প্রভাব বিস্তার এবং স্থানীয় পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিক গ্রুপ ˆতরি হচ্ছে| এসব গ্রুপের মধ্যে প্রতিযোগিতা অনেক সময় প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিচ্ছে| দলীয় সভা, কর্মসূচি এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে নেতাকর্মীদের| বিশেষ করে স্থানীয় রাজনীতিতে এই কোন্দল আরও তীব্র| জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থতা প্রায়ই সংঘর্ষের জন্ম দিচ্ছে| এতে দলীয় ঐক্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে|রাজনৈতিক কোন্দলের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ক্ষমতার লড়াই| ক্ষমতা ধরে রাখা বা অর্জনের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় নীতি, আদর্শ কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা গৌণ হয়ে পড়ে| ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি জোরদার হয়, যা দলীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর| নেতৃত্বের প্রশ্নে বিরোধ, প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে স্থানীয় নেতাদের অসন্তুষ্টি এসব বিষয় কোন্দলকে আরও উসকে দিচ্ছে| অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই দলের নেতারা ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়াচ্ছেন, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগজনক| ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্বও দিন দিন বাড়ছে| রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সময় প্রায়ই সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে| এতে করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে| বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন পক্ষ বলছে, বিরোধীরা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে| এই পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে|আরো পড়ুন: ড. ইউনূসসহ ২৪ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে লিগ্যাল নোটিশরাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে| বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন, নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যায়, এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও বাধাগ্রস্ত হতে পারে| ব্যবসায়ী মহল বলছে, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়| রাজনৈতিক কোন্দলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ| তারা সরাসরি রাজনীতির অংশ না হলেও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না| রাস্তাঘাটে নিরাপত্তাহীনতা, কর্মস্থলে অনিশ্চয়তা, এবং ˆদনন্দিন জীবনে বিঘ্ন সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে| শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়তে দেখা যায়| রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক সময় শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়| পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিতেও প্রভাব পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ক্ষতিকর|বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন ছাড়া এই কোন্দল থেকে বের হওয়া কঠিন| তাদের মতে, সংলাপ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়| তারা আরও বলেন, দলীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা জরুরি| পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য পরিহার করাও প্রয়োজন|আরো পড়ুন: ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনারসামগ্রিকভাবে বলা যায়, বর্তমান রাজনৈতিক কোন্দল দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে| এটি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনীতি, সমাজ এবং জনজীবনের ওপরও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে| এখন সময় এসেছে দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করার| মতবিরোধ থাকবেই, কিন্তু সেটি যেন সংঘাতে নয়, বরং আলোচনায় সমাধান হয় এটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের| অন্যথায় এই কোন্দলের ধারাবাহিকতা দেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে থাকবে|

কোন্দলের আগুনে পুড়ছে রাজনীতি