‘দুইটি ছাগলই নতুন জীবনের স্বপ্ন’ মনিরামপুরে অসহায় পরিবারের মুখে হাসি
“অনেক দিন পর মনে হচ্ছে, আমাদের ঘরেও হয়তো ভালো দিন আসবে। এই দুইটি ছাগল শুধু পশু নয়, আমার পরিবারের নতুন স্বপ্ন, নতুন ভরসা। যত্ন করে পালন করব, যেন একদিন এগুলোই আমাদের সংসারের অভাব দূর করতে পারে।”কথাগুলো বলছিলেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার জালালপুর গ্রামের হতদরিদ্র সুফিয়া খাতুন। জীবিকার অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের দীর্ঘ লড়াইয়ের মাঝে বিনামূল্যে দুইটি ছাগল হাতে পেয়ে তাঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও আশার আলো। একই অনুভূতির কথা জানান উপজেলার আরেক উপকারভোগী শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “এই সহায়তাকে আমি দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে ছাগল পালন করে পরিবারের আয় বাড়াতে চাই।”দারিদ্র্য বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যশোরের মনিরামপুরে অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে ছাগল বিতরণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে।বিশেষ বরাদ্দ ২০২৫–২০২৬ প্রকল্পের আওতায় মঙ্গলবার সকালে মনিরামপুর উপজেলার আশ্রয়ন সেবা সংস্থা (এএসএস)-এর কার্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ১৫টি অসহায় পরিবারের প্রত্যেককে দুইটি করে মোট ৩০টি ছাগল বিতরণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে আরও ১০টি পরিবারের মধ্যে ২০টি ছাগল বিতরণ করা হবে।বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং আশ্রয়ন সেবা সংস্থা (এএসএস)-এর বাস্তবায়নে আয়োজিত এ কর্মসূচির সভাপতিত্ব করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সুরাইয়া নার্গিস। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক এম. নূরুন্নবী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী লাভলী খাতুন।আরও পড়ুন, নিম্নচাপের প্রভাবে সাগরে ট্রলারডুবি, জীবিত ফিরলেন ১৬ জেলে নিখোঁজ ২ জেলেসভাপতির বক্তব্যে আশ্রয়ন সেবা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সুরাইয়া নার্গিস বলেন, আশ্রয়ন সেবা সংস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সংস্থার মূল লক্ষ্য শুধু অনুদান বিতরণ নয়; বরং মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এবং টেকসই জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা।তিনি বলেন, “একটি পরিবারের হাতে দুইটি ছাগল তুলে দেওয়া মানে শুধু একটি সম্পদ দেওয়া নয়, বরং তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করা। আমরা চাই উপকারভোগীরা এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাক। ভবিষ্যতে ছাগল থেকে বাচ্চা উৎপাদন, বিক্রয় এবং আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা যেন দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।”তিনি আরও বলেন, “মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করতে হলে দানের সংস্কৃতির চেয়ে সক্ষমতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ কারণেই আশ্রয়ন সেবা সংস্থা বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, নারী ক্ষমতায়ন এবং আয়বর্ধক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। আমাদের বিশ্বাস, আত্মনির্ভরশীল মানুষই একটি শক্তিশালী সমাজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।”প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক এম. নূরুন্নবী বলেন, একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন উন্নয়নের সুফল সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। সমাজের প্রান্তিক মানুষের হাতে উৎপাদনমুখী সম্পদ তুলে দেওয়ার মতো উদ্যোগ দারিদ্র্য হ্রাসে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।আরও পড়ুন, রাজবাড়ীর কালুখালীতে এইচএসসি পরীক্ষায় অসাধু উপায় অবলম্বন করায় বহিষ্কার ৫ পরীক্ষার্থীতিনি বলেন, “ছাগল বিতরণকে কেউ হয়তো ছোট উদ্যোগ ভাবতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি পরিবারের জন্য হতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তির সূচনা। সঠিক পরিচর্যা, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে এই ছোট উদ্যোগই একসময় বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। তাই এই সহায়তাকে শুধু অনুদান হিসেবে নয়, একটি দায়িত্ব ও সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।”তিনি আরও বলেন, “দেশের উন্নয়ন কেবল বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যেই প্রকৃত উন্নয়ন নিহিত। সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি এ ধরনের মানবিক উদ্যোগে আরও বেশি সম্পৃক্ত হন, তাহলে দারিদ্র্যমুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও সুগম হবে।”অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাকে অসহায় মানুষের কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, উপকারভোগী পরিবার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আয়োজিত এই কর্মসূচি উপকারভোগীদের মাঝে নতুন আশার আলো ছড়িয়ে দেয়। অনেকের মতে, একটি ছোট সহায়তাই পারে একটি পরিবারের ভাগ্য বদলের বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে।