দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

উচ্চশিক্ষায় প্রতিযোগিতা নয়, দরকার মানোন্নয়ন

সম্প্রতি দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এক মন্ত্রীর বক্তব্য। তার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে, নাকি দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো? যদিও পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য প্রত্যাহার করেন, তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন টকশো এবং শিক্ষাঙ্গনে বিতর্ক থামেনি।তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রশ্নটি নিজেই কিছুটা বিভ্রান্তিকর। কারণ উচ্চশিক্ষাকে ‘পাবলিক বনাম প্রাইভেট’ প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। একটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।আরও পড়ুন, আটক ঘটনার পর চবি ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার করল কেন্দ্রীয় কমিটিবাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে স্বাধীনতার পর উচ্চশিক্ষার চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল না। সেই শূন্যস্থান পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।বর্তমানে দেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। অনেক পরিবার বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে দেশীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নিচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে এবং দেশেই দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠছে। বিশ্বের দিকে তাকালেও দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে সরকারি বা বেসরকারি পরিচয় মুখ্য নয়। Harvard University, Stanford University, Massachusetts Institute of Technology, Yale University কিংবা Princeton University বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েও বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দিচ্ছে।আরও পড়ুন, জাল সনদে ১৪১ শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশঅন্যদিকে University of Oxford, University of Cambridge, University of California, Berkeley, Peking University এবং National University of Singapore সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়েও বিশ্বসেরাদের তালিকায় রয়েছে। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন এখনো বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছাতে পারছে না? কেন গবেষণায় বিনিয়োগ সীমিত? কেন প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে?একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা নয়, বরং তার গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ক্যাম্পাসের আয়তন বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে তার অবদান দিয়ে পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন ও মৌলিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। অন্যদিকে অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন, তথ্যপ্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও কর্মমুখী শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দুটি ধারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক।আরও পড়ুন, ঢাকায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ঈদ উপহার দিল জকসুউন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। তাই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়’ বিতর্কে সময় ব্যয় না করে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের গবেষণা পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী দক্ষতা বিকাশে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।আরও পড়ুন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পোস্টারিং কারণ শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাফল্য যেমন বাংলাদেশের সাফল্য, তেমনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যও বাংলাদেশের সাফল্য। কোনো একক প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পরিচয় বহন করে।

উচ্চশিক্ষায় প্রতিযোগিতা নয়, দরকার মানোন্নয়ন