দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

বনানীতে হোটেল ‘মার্ভেল ইন’ নিয়ে বিতর্ক, স্কর্ট সার্ভিসের আড়ালে ভয়ংকর চিত্র! (পর্ব-২)

রাজধানীর অভিজাত ও কূটনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত বনানী দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চমানের আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও করপোরেট অফিসের জন্য সুপরিচিত। তবে সম্প্রতি এই এলাকায় অবস্থিত ‘মার্ভেল ইন’ নামের একটি হোটেলকে ঘিরে নানা অভিযোগ, যদিও চলছে রমজান মাস তবুও প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে এসেছে হোটেলটি ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি হোটেলটির কার্যক্রম শুধুমাত্র আবাসিক সেবায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং “স্কর্ট সার্ভিস” নামে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। প্রথম পর্ব প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়, যখন হোটেল মালিক স্বয়ং ‘সংবাদ দিগন্ত’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে দাবি করেন তাদের প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বৈধ এবং সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। হোটেলটি বনানীর আবাসিক এলাকায় ২৭ নং রোডে একটি ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত কয়েক মাস ধরে হোটেলটিতে অস্বাভাবিক মাত্রায় নারী-পুরুষের যাতায়াত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে রাত গভীর হলে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে অতিথি আনা-নেওয়ার প্রবণতা চোখে পড়ে। এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, কিন্তু যদি এখানে আবাসিক হোটেলের আড়ালে অন্য কিছু চলে, সেটি আমাদের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের স্বেচ্ছায় যৌন পেশায় যুক্ত থাকার বিষয়টি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত না হলেও, আবাসিক হোটেলে বাণিজ্যিকভাবে “স্কর্ট সার্ভিস” পরিচালনা করা আইনগতভাবে বৈধ কি না তা নিয়ে রয়েছে স্পষ্ট প্রশ্ন।এদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান জেনেশুনে দালালচক্রের মাধ্যমে নারী সরবরাহ, বাণিজ্যিক যৌন লেনদেনের সুযোগ প্রদান বা জোরপূর্বক সম্পৃক্ততার মতো কার্যক্রমে সহায়তা করে, তবে তা একাধিক আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পেনাল কোড ১৮৬০ এর ২৯৪, ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় অশ্লীল কার্যকলাপ, দালালি ও যৌন শোষণ সম্পর্কিত অপরাধের বিধান রয়েছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ জোরপূর্বক যৌন শোষণ বা প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সম্পৃক্ত করার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। আর মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ অনুযায়ী প্রলোভন, প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে কাউকে যৌন বাণিজ্যে সম্পৃক্ত করা গুরুতর অপরাধ, যার শাস্তি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।আইনজীবীদের মতে, কেবল ট্রেড লাইসেন্স বা হোটেল নিবন্ধন থাকলেই প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম বৈধ হয়ে যায় না। কার্যক্রমের প্রকৃতি যদি আইনবিরোধী হয়, তবে সংশ্লিষ্ট মালিক, ব্যবস্থাপক বা জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের হতে পারে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয় না। হোটেল মালিক দাবী করেন. আমাদের ট্রেড লাইসেন্স, সিটি করপোরেশনের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে যে কোনো সময় তাদের কাগজপত্র যাচাই করতে পারে। তবে যখন প্রশ্ন করা হয়—ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া বা স্কর্ট সার্ভিস সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে, তখন তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং বলেন, আমরা স্বল্প সময়ের ট্রানজিট গেস্টও গ্রহণ করি, যা হোটেল ব্যবসার অংশ।আমাদের সন্তানরা এখানে বড় হচ্ছে। যদি হোটেলের আড়ালে অসামাজিক কিছু চলে, সেটি পুরো এলাকার পরিবেশ নষ্ট করবে। এতে বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম নয়, পুরো এলাকার ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি জটিল ও সংবেদনশীল। তবে বাণিজ্যিকভাবে সংগঠিত যৌন লেনদেন, দালালি বা জোরপূর্বক সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্টতই শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে। বৈধ লাইসেন্স থাকলেই প্রতিষ্ঠান সব দিক থেকে বৈধ হয় না। কার্যক্রমের প্রকৃতি, লেনদেনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা বিবেচনায় নিতে হবে।আরও পড়ুন, মহেশপুরে যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভির শ্রদ্ধার সাথে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত‘মার্ভেল ইনকে ঘিরে অভিযোগ ও পাল্টা দাবি এখনো প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত অবস্থায় রয়েছে। একদিকে স্থানীয়দের উদ্বেগ, অন্যদিকে মালিকের দৃঢ় অস্বীকার এই দুইয়ের মধ্যে সত্য উদঘাটনে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত। বনানীর অভিজাত পরিবেশে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বৈধতার আড়ালে অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তবে তা শুধু আইনভঙ্গ নয়, সমাজের প্রতি এক ধরনের প্রতারণা। এদিকে হোটেল মালিকের বিরুদ্ধে রাজধানীর আরেক এলাকায় পরিচালিত একটি স্পা সেন্টারকে ঘিরে আইনি জটিলতায় জড়িয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল সেই স্পা প্রতিষ্ঠানে অনুমোদনহীন কার্যক্রম ও অসামাজিক তৎপরতা চলত। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানও পরিচালনা করে এবং পরবর্তীতে একটি মামলা দায়ের হয়। যদিও মামলাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক আদালত নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি, তবে একাধিক সূত্র বলছে মামলাটি এখনো বিচারাধীন অথবা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।বনানী থানার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মার্ভেল ইন হোটেল সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে, আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি লাইসেন্সধারী হয়, তা হলেও তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ আইনসম্মত হতে হবে। স্কর্ট সার্ভিস বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি এবং প্রয়োজন হলে কাগজপত্র, অতিথি নিবন্ধন বই ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করি এবং কোনো অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না।

বনানীতে হোটেল ‘মার্ভেল ইন’ নিয়ে বিতর্ক, স্কর্ট সার্ভিসের আড়ালে ভয়ংকর চিত্র! (পর্ব-২)