২৫ বছরেও মেলেনি বর্জ্য সমস্যার সমাধান, প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ সোনারগাঁয়ের পরিবেশ সংগঠন
নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী উপজেলা সোনারগাঁয়ে দীর্ঘ ২৫ বছরেও গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বা স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণ। কিন্তু সেই তুলনায় বর্জ্য সংগ্রহ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সোনারগাঁয়ের বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি (ইএসএডিএস)।২০০১ সালে সোনারগাঁ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ২৫ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন। ফলে প্রতিদিন উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য কোথায় এবং কীভাবে নিরাপদে নিষ্পত্তি করা হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন সড়ক, বাজার, নদী-খালের পাড় এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকার আশপাশে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্যের স্তূপ দুর্গন্ধ ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালি বর্জ্য জলাশয়ে জমে পানিদূষণের পাশাপাশি মশা-মাছির বিস্তার এবং রোগব্যাধির ঝুঁকি তৈরি করছে।শিল্পকারখানায় সমৃদ্ধ এ উপজেলায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাজার ও আবাসিক এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এসব বর্জ্য যথাযথভাবে পৃথকীকরণ ও নিষ্পত্তি করা না হলে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসাবর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।এ ছাড়া নদী-খাল ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার কারণে জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এসব বর্জ্য ড্রেন ও পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে জলাবদ্ধতার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।এ অবস্থায় সোনারগাঁয়ের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি স্থায়ী ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন ও মহাসচিব মীযানুর রহমানের পক্ষ থেকে স্মারকলিপিটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।স্মারকলিপিতে সোনারগাঁয়ের বর্তমান পরিবেশগত সংকট বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও পরিবেশসম্মত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি উপজেলার উপযুক্ত স্থানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন, গৃহস্থালি, শিল্প ও বাজারের বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ এবং হাসপাতাল-ক্লিনিকের চিকিৎসাবর্জ্য নিরাপদে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।আরো পড়ুন,বাসন থানা পুলিশের বিশেষ অভিযান: মাদক, চুরি, দস্যুতা ও ওয়ারেন্টভুক্তসহ গ্রেপ্তার ১০এ ছাড়া শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, নদী-খাল ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা বন্ধে নিয়মিত অভিযান, মহাসড়কের পাশের ময়লার স্তূপ অপসারণ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে সম্পদ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদনের ব্যবস্থার কথাও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।সংগঠনটির মতে, শুধু ময়লা সংগ্রহ করে অন্য কোথাও ফেলে দিলেই বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য বর্জ্যের উৎস থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত একটি কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির মহাসচিব মীযানুর রহমান বলেন, সোনারগাঁয়ের পরিবেশ রক্ষা এখন সময়ের দাবি। বছরের পর বছর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় নদী-খাল, মহাসড়ক ও জনবসতি দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য সোনারগাঁ রেখে যেতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন।তিনি আরও বলেন, সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।স্মারকলিপিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে সোনারগাঁয়ে স্থায়ী আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন এবং সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।সোনারগাঁয়ের সচেতন মহলের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর যথাযথ হস্তক্ষেপে দীর্ঘদিনের এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে। মহাসড়কের পাশের ময়লার স্তূপ, নদী-খালের দূষণ এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে ঐতিহ্যবাহী এ জনপদ। আগামী প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন, সুস্থ ও বাসযোগ্য সোনারগাঁ গড়ে তুলতে এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন।