মেঘ-পাহাড়ের টানে লামায় ছুটছেন পর্যটক
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সাদা মেঘে চারপাশ ঢেকে আছে। কোথাও পাহাড়ের চূড়া দেখা যাচ্ছে, আবার মুহূর্তেই তা হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। দূরে আঁকাবাঁকা মাতামুহুরী নদী, তার ওপারে সারি সারি সবুজ পাহাড়। সূর্য উঠতেই মেঘের চাদর সরতে শুরু করে—প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে খুলে দেয় তার সৌন্দর্যের দরজা।এ দৃশ্য এখন আর শুধু স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। বান্দরবানের লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পাহাড় ও আশপাশের এলাকা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে নতুন পর্যটন গন্তব্য।লামার মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্সের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর একটি ‘টাইটানিক পয়েন্ট’। পাহাড়ের চূড়ায় জাহাজের আদলে তৈরি স্থাপনা থেকে দেখা যায় বিস্তীর্ণ পাহাড়, নদী আর দূরের সাগর উপকূলের দৃশ্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দেড় হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা এই পর্যটনকেন্দ্রটি লামার পর্যটনের পুরোনো পরিচিতি।তবে এখন শুধু সরকারি পর্যটন কমপ্লেক্সেই থেমে নেই লামার পর্যটন। মিরিঞ্জা ভ্যালি ও আশপাশের পাহাড়জুড়ে গড়ে উঠেছে একের পর এক রিসোর্ট ও কটেজ। সুখিয়া ভ্যালি, মিরিঞ্জা হিল, মারাইংছা হিল, মেঘ মাচাং, চুংদার, ডেঞ্জার হিল, মেঘকুঞ্জ, জঙ্গলভিলা ও মিরিঞ্জা ইকো রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা পর্যটকদের রাতযাপন ও পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগের সুযোগ করে দিচ্ছে।এর মধ্যে সুখিয়া ভ্যালি যেন আলাদা এক গল্প। দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে মাতামুহুরী নদী।আরও পড়ুন,সরকারকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা হলে প্রতিহত করা হবে: বিমানমন্ত্রী পাহাড়ের চূড়ায় বাঁশের মাচাংঘর, কাঠের কটেজ ও ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা যায় মেঘের ভেলা, নদীর আঁকাবাঁকা পথ এবং সূর্যাস্ত। ভোরে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারদিকে শুধু মেঘ আর মেঘ—এ দৃশ্যই পর্যটকদের টেনে আনছে বারবার।বর্তমানে মিরিঞ্জা এলাকায় পর্যটকদের থাকার জন্য নানা ধরনের রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে , , এবং পর্যটকদের কাছে পরিচিত নাম। পাশাপাশি রয়েছে ও সহ আরও বিভিন্ন আবাসন ব্যবস্থা।স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। রিসোর্ট, পরিবহন, খাবারের দোকান, স্থানীয় পণ্য বিক্রি ও গাইডিং—বিভিন্ন খাতে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু উদ্বেগও। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে মিরিঞ্জা ভ্যালিতে অপরিকল্পিতভাবে রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে ওঠা, পাহাড় কাটা, গাছপালা নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়টি উঠে এসেছে।গত কয়েক বছরে মিরিঞ্জা এলাকায় রিসোর্টের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। অর্থাৎ, লামার পর্যটন এখন শুধু পাহাড় দেখার গল্প নয়। এটি একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা, অন্যদিকে পাহাড়-প্রকৃতি রক্ষার বড় দায়িত্বও।প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পর্যটনশিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে পাহাড় কাটা, নির্বিচারে গাছ কাটাসহ পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ সড়ক, পর্যটকদের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।তাহলেই মিরিঞ্জার পাহাড়ে মেঘের খেলা, মাতামুহুরীর আঁকাবাঁকা পথ আর সবুজের সমারোহ শুধু আজকের পর্যটকদের নয়—আগামী প্রজন্মের কাছেও একইভাবে আকর্ষণ হয়ে থাকবে।পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ, নিচে নদী আর চারপাশে সবুজের সমারোহ—লামা যেন ধীরে ধীরে নিজের নতুন পরিচয় লিখছে পর্যটনের মানচিত্রে।