দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

গ্যাস ডিপোর সামনে বিসিকের বর্জ্যে আগুন, ভয়াবহ দুর্ঘটনার শঙ্কা

ঝিনাইদহ বিসিক শিল্পনগরীর ফেলে রাখা বর্জ্যে একদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ, অন্যদিকে রাস্তার পাশে গ্যাস ডিপোর সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে জমে থাকা বর্জ্যে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকি। গ্যাস ডিপো, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও জনসাধারণের চলাচলের রাস্তার পাশে এভাবে বর্জ্য জমে থাকা এবং তাতে আগুন জ্বলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।স্থানীয়দের অভিযোগ, বিসিক শিল্পনগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে উৎপন্ন বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা না করায় রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন জায়গায় বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হচ্ছে। দিনের পর দিন এসব বর্জ্য পড়ে থাকায় পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বর্জ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কারণে আশপাশের এলাকায় ধোঁয়া ও দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাস্তার পাশে গ্যাস ডিপোর সামনে। সেখানে বৈদ্যুতিক খুঁটির ঠিক নিচে জমে থাকা বর্জ্য জ্বলতে দেখা গেছে। আগুনের খুব কাছেই গ্যাসের স্থাপনা এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকায় যেকোনো সময় আগুন ছড়িয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।নোটিশ ও মোবাইল কোর্টের পরও উন্নতি নেইবিসিক শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ইতিপূর্বেই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর, ঝিনাইদহের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মুনতাসির রহমান।তিনি জানান, বিসিক শিল্পনগরীর পরিচালক/পরিশোধককে ইতিপূর্বেই নোটিশ জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও বিসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন দেখা যায়নি বলে জানান তিনি।সংবাদ দিগন্তকে মোহাম্মদ মুনতাসির রহমান বলেন, বিষয়টি তার নজরে রয়েছে। ইতিপূর্বে নোটিশ জারি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। এ বিষয়ে তার জায়গা থেকে যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশা ব্যক্ত করেন।আরও  পড়ুন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে দুদকের অভিযানে নানা অনিয়মের তথ্যপরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বিসিক শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে এর আগেও প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা ও নজরদারি নিয়ে।বর্জ্য পোড়ানোয় বাড়ছে বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিশেষজ্ঞদের মতে, মিশ্র বর্জ্য খোলা জায়গায় পোড়ালে ধোঁয়ার সঙ্গে ক্ষতিকর কণা ও বিভিন্ন দূষণকারী পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে প্লাস্টিক, রাবার বা শিল্পবর্জ্য থাকলে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিধিমালা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিমালার তালিকায় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ (সংশোধিত), বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ রয়েছে।ফলে শিল্পকারখানার বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্জ্য পোড়ানো কিংবা এর মাধ্যমে পরিবেশ ও বায়ু দূষণের সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের দাবিস্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু নোটিশ কিংবা একবারের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিসিক শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত নজরদারি এবং আইন বাস্তবায়ন জরুরি।বিশেষ করে গ্যাস ডিপো ও বৈদ্যুতিক খুঁটির মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার পাশে বর্জ্য জমে থাকা এবং সেখানে আগুন জ্বলার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিকভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন তারা।তাদের দাবি, বিসিক শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট ও নিরাপদ স্থান নির্ধারণ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কাস্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো গ্যাস ডিপোর সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে বর্জ্যে আগুন জ্বলার ঘটনা। আগুন কোনোভাবে গ্যাসের স্থাপনা কিংবা বৈদ্যুতিক লাইনের সংস্পর্শে গেলে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।তাদের প্রশ্ন, আরও  পড়ুন , টাঙ্গাইলে ব্যতিক্রমী আয়োজনে বেকার ২ হাজার ২৭ জন তরুণ- তরুণীবড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি তার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে?স্থানীয়রা মনে করছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইতিমধ্যে নোটিশ ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার ধারাবাহিকতায় এবার কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।স্থায়ী সমাধানের দাবিএলাকাবাসীর মতে, বিসিক শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কোন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের বর্জ্য উৎপাদন করছে, কোথায় তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং কীভাবে তা অপসারণ করা হচ্ছে—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার পাশে বর্জ্য ফেলা এবং বর্জ্যে আগুন দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইন ও প্রযোজ্য বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মুনতাসির রহমানের দেওয়া কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। একই সঙ্গে বিসিক কর্তৃপক্ষও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুরবস্থা দূর করে শিল্পনগরীকে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।কারণ, বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণের বিষয়টি যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের, তেমনি গ্যাস ডিপো ও বৈদ্যুতিক খুঁটির সামনে বর্জ্যে আগুন জ্বলার ঘটনা তৈরি করেছে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি। আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

গ্যাস ডিপোর সামনে বিসিকের বর্জ্যে আগুন, ভয়াবহ দুর্ঘটনার শঙ্কা