ফুলবাড়িয়ায় আড়াইশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক গম্বুজের জোরবাড়িয়া খানবাড়ি মসজিদ
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার জোরবাড়িয়া গ্রামে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী প্রাচীন স্থাপনা ফুলবাড়িয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের জোরবাড়িয়া গ্রামের পূর্বভাটিপাড়া এলাকায় প্রায় আড়াইশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন খানবাড়ি জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘খানবাড়ি মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। নান্দনিক কারুকাজ, পুরু দেয়াল এবং চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এই মসজিদটি এলাকার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১২০০ হিজরি সালে তৎকালীন প্রভাবশালী ও দানশীল ব্যক্তি হায়াত খান এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে নির্মিত মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৪০ ইঞ্চি। চৌকো কাঠামোর ওপর ছাদজুড়ে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ এবং চার কোণে চারটি পিলার, যার ওপরের অংশ কলসি আকৃতির কারুকাজে অলংকৃত। মসজিদের ভেতর ও বাইরের কারুকাজ আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।আরও পড়ুন, গঙ্গাচড়ায় জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস উপলক্ষে মহড়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিতমসজিদের সামনে শানবাঁধানো ঘাটসহ প্রায় এক একর আয়তনের একটি পুকুর এবং পেছনে প্রায় ৫২ শতাংশ জমির আরেকটি পুকুর রয়েছে। মসজিদের দুই পাশে রয়েছে কবরস্থান, যেখানে এলাকার মৃত ব্যক্তিদের দাফন করা হয়। পুকুরের পানিতে মসজিদের ছায়া ভেসে ওঠা দৃশ্যটি দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, মসজিদ নির্মাণের সময় দেশে সিমেন্টের ব্যবহার ছিল না। তাই চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে অত্যন্ত মজবুতভাবে এটি নির্মাণ করা হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই মসজিদের নির্মাণকাজে ফ্রান্স থেকে কারিগর আনা হয়েছিল।মসজিদের পাশেই রয়েছে ‘বিবিঘর’ নামে পরিচিত একটি ঘর। একসময় অসুস্থতার নিরাময়ের আশায় মানুষ এখানে মানত করতেন। জুমার নামাজ শেষে সেই মানতের শিরনি মুসল্লিদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। বর্তমানে এ প্রথা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সাত্তার খান বলেন, এই মসজিদ যখন নির্মাণ করা হয়, তখন সিমেন্ট ছিল না। চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। শুনেছি ফ্রান্স থেকে লোক এনে এই মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। যিনি মসজিদটি নির্মাণ করেন, তিনি অনেক ধনী ছিলেন এবং মসজিদের জন্য সাত একর জমি দান করে গেছেন।”আরও পড়ুন, গ্রেডিং ও ইনক্রিমেন্ট স্থবিরতায় যমুনা অয়েলে বাড়ছে শ্রমিক-কর্মচারীদের অসন্তোষমসজিদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম খান জানান, হায়াত খান মৃত্যুর আগে মসজিদের নামে সাত একর জমি দান করে যান। ওই জমির আয় থেকেই বর্তমানে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। আসরের নামাজ শেষে মুসল্লি মো. জাকির হোসেন বাপ্পি খান বলেন, এই মসজিদে নামাজ পড়তে খুব ভালো লাগে। গরমে ভেতরে ঠান্ডা এবং শীতে উষ্ণ অনুভূত হয়। প্রকৌশলীরা বলেছেন, হয়ত আরও এক থেকে দেড় শ বছরেও মসজিদের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না।”আরও পড়ুন, লামা উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণামসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মজিবুর রহমান খান বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মসজিদ নির্মাণ করে গেছেন। আমরা নিজেরাই অর্থের জোগান দিয়ে এটি পরিচালনা করি। এই মসজিদ পরিচালনার জন্য বাইরে থেকে কোনো দান গ্রহণ করা হয় না।” প্রায় আড়াই শ বছরের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে আজও দাঁড়িয়ে আছে খানবাড়ি মসজিদ। স্থানীয় বাসিন্দারা চান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা হোক।