দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

চামড়ার ন্যায্যমূল্য মিলছে না, বিপর্যয়ের মুখে শিল্পখাত

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চামড়াশিল্প এখন গভীর সংকটে। কুরবানির ঈদকে ঘিরে যে একসময় বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ তৈরি হতো, তা এখন কার্যত থমকে যাওয়ার পথে। মূলধন সংকট, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং কাঠামোগত দুর্বলতায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।আরও পড়ুন, কম দামে পোশাক বিক্রির পরও ইইউ বাজারে অর্ডার কমছে, চাপে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতখাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে এবার বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে প্রধানত পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো—তীব্র তারল্য ও ব্যাংক ঋণ সংকট, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর (বিসিক) ব্যর্থতা, লবণ ও কেমিক্যালের দাম বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতা।ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় নগদ টাকার সংকট তীব্র হয়েছে। ফলে কাঁচা চামড়া কেনার সক্ষমতা কমে গেছে। কয়েক বছর ধরেই ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ বিতরণ কমিয়ে দিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর আস্থাও কমে গেছে। এদিকে সরকার এ বছর ঢাকায় গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। এই হিসাবে একটি গরুর চামড়ার দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কয়েক বছর ধরে তা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।আরও পড়ুন, কোরবানির ঈদ ঘিরে মসলার বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা, বাড়ছে জিরা-এলাচ-লবঙ্গের দামঅন্যদিকে বকরির চামড়া প্রায় অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকছে বলে জানা গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করছে। চামড়া ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলছেন, বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অনভিজ্ঞতার কারণে কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আফতাব খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সনদ বাংলাদেশ এখনো অর্জন করতে পারেনি। পাশাপাশি সাভারের ট্যানারিগুলোতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।আরও পড়ুন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, বাড়ছে ঋণনির্ভরতাবাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাতে অর্থ ছাড় দিচ্ছে না। সাভারে স্থানান্তরের পর থেকে অধিকাংশ ট্যানারি লোকসানে রয়েছে। আড়তদারদের হাতে নগদ অর্থ না থাকলে তারা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে পারে না।”তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর কুরবানির আগে চামড়া কেনার জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সিংহভাগ ট্যানারি মালিকই সেই সুবিধা পান না। এ বছর চামড়া সংরক্ষণে ২২৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে তা ১০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসতে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। ফলে কুরবানির ঈদ ঘিরে চামড়াশিল্প আবারও বড় ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।

চামড়ার ন্যায্যমূল্য মিলছে না, বিপর্যয়ের মুখে শিল্পখাত