দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

উদীচীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাতক্ষীরায় ছয় গুণিজনকে সংবর্ধনা

অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরে সাতক্ষীরায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, গুণিজন সংবর্ধনা, আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ, চিকিৎসাসেবা ও সংগীতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ছয় গুণিজনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় সাতক্ষীরা শহরের শহীদ নাজমুল সরণিতে ম্যানগ্রোভ সভাঘরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সাতক্ষীরা জেলা সংসদ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ২৯ অক্টোবর সংগঠনটির ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে জেলার বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সাতক্ষীরা জেলা সংসদের সভাপতি শেখ সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শেখ মোসফিকুর রহমান মিল্টন ও কবি মৃত্যুঞ্জয় কুমার বিশ্বাস। শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সংগীতবিষয়ক সম্পাদক বিউটি চক্রবর্তী। স্বাগত বক্তব্য দেন সভাপতি শেখ সিদ্দিকুর রহমান এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক সুরেশ পান্ডে। আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, উদীচী কেবল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, বরং গণমানুষের অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশীদার। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গান, নাটক, কবিতা, আবৃত্তি ও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগঠনটি অন্যায়-অবিচার, আরও পড়ুন,ড্রোন দিয়ে জেলে ধরতে পারেন, ডাকাত ধরতে পারেন না কেন?’ শ্যামনগরে জেলেদের ক্ষোভসাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে আসছে। তাঁরা বলেন, সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব, যুক্তিবোধ, প্রতিবাদী চেতনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি জাগিয়ে তোলে। গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসি দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণেও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তাঁরা। আলোচনায় অংশ নেন উদীচী সাতক্ষীরা জেলা সংসদের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ, সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি ড. আক্তারুজ্জামান, উদীচী সাতক্ষীরার সাবেক সভাপতি ও আবৃত্তিশিল্পী মনিরুজ্জামান ছট্টু, সহসভাপতি কমরেড আবুল হোসেন, উন্নয়নকর্মী মাধব দত্ত, সাহিত্য সংস্কৃতি সংস্থার খুলনা বিভাগীয় সভাপতি এস এম আয়ুব আলী, কবি কিশোরী মোহন দাশসহ অন্যরা।অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ছয় গুণিজনকে সংবর্ধনা প্রদান। সংবর্ধিত ব্যক্তিরা হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী রিয়াজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোস্তফা নুরুল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. মোসলেম, সাবেক সিভিল সার্জন ডা. এবাদুল্লাহ এবং সংগীতশিল্পী আবু আফ্ফান রোজবাবু ও চৈতালি মুখার্জি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। সংবর্ধিত বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী রিয়াজ মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোস্তফা নুরুল আলম ও অ্যাডভোকেট মো. মোসলেম সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন। সাবেক সিভিল সার্জন ডা. এবাদুল্লাহ অসহায় ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় বিশেষ অবদান রেখেছেন। স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং সামর্থ্যহীন রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি এলাকায় ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত।আরও পড়ুন,পাবনায় বিলে পলিথিনের ঘরে বজ্রপাত: একসঙ্গে ৬ তরুণের মৃত্যুএ ছাড়া সংগীতশিল্পী আবু আফ্ফান রোজবাবু ও চৈতালি মুখার্জি দীর্ঘদিনের সংগীতচর্চা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। বক্তারা বলেন, সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখা গুণী মানুষদের যথাযথ সম্মান জানানো নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের জীবনসংগ্রাম, দেশপ্রেম, পেশাগত নিষ্ঠা ও সাংস্কৃতিক অবদান নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুণীজনদের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি মানবিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে মানুষকে উৎসাহিত করবে। পরে আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আবৃত্তি করেন মনিরুজ্জামান ছট্টু। সংগীত পরিবেশন করেন আবু আফ্ফান রোজবাবু, চৈতালি মুখার্জি ও অদ্বিতীয়া মুখার্জি। তাঁদের পরিবেশনায় উদীচীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের নানা দিক ফুটে ওঠে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কবি শুভ্র আহমেদ, বাংলাদেশের জাসদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, বাসদের জেলা সমন্বয়ক নিত্যানন্দ সরকার, কবি আবু কাজী, নাট্যশিল্পী শেখ আব্দুল ওয়াহেদ, কাজী মাসুদুল হক, মনিরুল ইসলাম, মুনসুর রহমান, মনিরুজ্জামান মুন্নাসহ জেলার বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও উদীচীর সদস্যরা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়া, গুণীজনদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও প্রগতিশীল চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজকেরা।

উদীচীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাতক্ষীরায় ছয় গুণিজনকে সংবর্ধনা