দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরাকের নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অধ্যায় শেষ হয়েছে। তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ইরাকের সামনে তৈরি হয়েছে একাধিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতে মার্কিন অভিযান শুরুর পর থেকেই ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থানের পর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আবারও মার্কিন বাহিনী ইরাকে ফিরে আসে। বাগদাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ২০২৪ সালে হওয়া সমঝোতার ধারাবাহিকতায় এবার সেই সামরিক উপস্থিতির অবসান হলো।মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরাকে ইরানঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরাকের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দেশটিতে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর উপস্থিতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মার্কিন সেনা চলে যাওয়াকে ইরানের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইরাকের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং কুর্দি নেতৃত্বের অবস্থানও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে।নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে আছে আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক।আড়ও পড়ুন,পাকিস্তানের আকাশ বন্ধ, ইউরোপ যেতে হোটানের আকাশপথ চাইছে ভারত ২০১৭ সালে ইরাকে আইএসের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের অবসান হলেও সংগঠনটির বিচ্ছিন্ন সদস্য ও গোপন সেলগুলোর তৎপরতার ঝুঁকি রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা কমে গেলে জঙ্গিদের শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা আরও কঠিন হতে পারে।তবে ইরাকি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় অব্যাহত থাকলে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সংঘাতপ্রবণ এলাকায় কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য সংগ্রহের সুযোগ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হলে তেল সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তেল আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইরাকের জন্য দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাত অর্থনীতি ও সরকারি রাজস্বের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।সব মিলিয়ে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইরাকের জন্য একদিকে সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব নিরাপত্তানীতি জোরদারের সুযোগ, অন্যদিকে নতুন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পরীক্ষার সূচনা। ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বাগদাদ কীভাবে নিজের জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও আঞ্চলিক ভারসাম্য ধরে রাখে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।