দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

ইয়াবার ‘হটস্পট’ মাদারবাড়ির এসআরবি স্টেশন নেপথ্যে জসিম-ঝুমকা বাদল সিন্ডিকেট

চট্টগ্রাম মহানগরীর সদরঘাট থানাধীন পশ্চিম মাদারবাড়ি রেলবিটের এসআরবি স্টেশনসংলগ্ন এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের একটি সক্রিয় স্পটে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এসআরবি স্টেশনের পোলের গোড়ায় মানিকের লোহার দোকানের সামনে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মরণনেশা ইয়াবা ট্যাবলেট কেনাবেচা চলে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি।অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মাদকসহ একাধিক মামলার আসামি জসিম ও মাদারবাড়ি এসআরবি স্টেশন এলাকার মা-ছেলে খুনসহ একাধিক মামলার আসামি ঝুমকা বাদল নামে পরিচিত দুই ব্যক্তি। স্থানীয়দের দাবি, তাদের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ওই এলাকায় মাদক সংগ্রহ, সরবরাহ ও খুচরা বিক্রির নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এসআরবি স্টেশনের পোলের গোড়ায় কালুর দোকানের সামনে প্রতিদিন মাদক বেচাকেনা চলে। সেখানে জসিম-ঝুমকা বাদলের সিন্ডিকেটের সদস্যরা খুচরা ক্রেতাদের কাছে ইয়াবা সরবরাহ করে বলে তাদের অভিযোগ।উল্লেখ্য যে, গেল কিছুদিন পূর্বে এসআরবি স্টেশন এলাকায় সিএমপির সদরঘাট জোনের সহকারি পুলিশ কমিশনার সহ সদরঘাট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন মাদক সেবীদের ও উক্ত এলাকা থেকে আটক করেছিল।মাদারবাড়ি এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “রাতে কে কোন বাড়িতে ঢুকছে বা বের হচ্ছে, তা বোঝার উপায় থাকে না। প্রতিদিনই এখানে বড় অঙ্কের মাদকের লেনদেন হয় বলে আমরা শুনি। প্রতিবাদ করতে মানুষ ভয় পান। তিনি আরো বলেন, প্রতিবাদ করলেই হামলার স্বীকার হতে হয় অতীতে তাদের এই মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে অনেকেই গুরুতর হামলার শিকার হয়েছে।"আরও  পড়ুন, মহেশপুরে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে বৃদ্ধ আটকস্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে চক্রটি নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখছে। ফলে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস করছেন না অনেকে।সূত্রগুলোর আরো দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে মাদক কারবারের টাকা দিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেছেন জসিম ও ঝুমকা বাদল। এছাড়াও বর্তমানে তাদের সিন্ডিকেটে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। তাদের কেউ মাদক সংগ্রহ, কেউ সরবরাহ, কেউ খুচরা বিক্রির দায়িত্বে থাকে বলে অভিযোগ।অভিযোগের বিষয়ে মো. জসিমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, “ইয়াবা ব্যবসার টাকা আমি একা খাই না, সবাইকে নিয়ে খাই।"স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি এলাকায় দিনের পর দিন প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগ থাকলেও তা কীভাবে অব্যাহত রয়েছে। তাদের দাবি, কেবল খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, অর্থায়ন, সরবরাহকারী, স্থানীয় সহযোগী এবং অবৈধ সম্পদের সন্ধান করতে সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।এক সামাজিক সংগঠনের নেতা বলেন, “এটি শুধু মাদক বিক্রির বিষয় নয়। এর প্রভাব পুরো এলাকার তরুণ সমাজের ওপর পড়ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এসআরবি স্টেশনকেন্দ্রিক এই সমস্যা আরও বিস্তৃত হতে পারে।”মাদারবাড়ি এলাকার কয়েকজন অভিভাবক জানান, সহজে মাদকের সহজলভ্যতাথ পাওয়ার কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া সন্তানদের নিয়ে তাদের উদ্বেগ বাড়ছে। এক অভিভাবক বলেন,“ছেলেমেয়েরা কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তা নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকতে হয়। এলাকায় মাদকের এমন সহজলভ্যতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।”আরও  পড়ুন, আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে গঙ্গাচড়ার মাটির তৈজসপসংশ্লিষ্টদের মতে, ইয়াবা বা অন্য কোনো মাদকের বিস্তার শুধু একজন ব্যবহারকারীর ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পরিবার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অপরাধপ্রবণতা ও সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ে।মাদকবিরোধী কার্যক্রম সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সংঘবদ্ধ মাদক নেটওয়ার্ক ভাঙতে শুধু মাঠপর্যায়ের বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। কারবারের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা অর্থায়ন করছে, কীভাবে অর্থ লেনদেন হচ্ছে এবং মাদক থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে কোনো সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও তদন্ত করা জরুরি। প্রয়োজন হলে ব্যাংকিং লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সন্দেহজনক সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক কার্যক্রম আইনি প্রক্রিয়ায় খতিয়ে দেখা উচিত।এ বিষয়ে সদরঘাট থানার ওসি (তদন্ত) বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। স্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উক্ত এলাকায় অভিযান আরও জোরদার করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। মাদক স্পট পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”মাদারবাড়ির বাসিন্দাদের মতে, জসিম বা ঝুমকা বাদলকে আইনের আওতায় আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাদকের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল, অর্থায়নের উৎস, সহযোগী নেটওয়ার্ক, সম্ভাব্য আশ্রয়দাতা এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিষয়েও অনুসন্ধান প্রয়োজন। এসআরবি স্টেশনের মাদকের এই সহজলভ্যতা আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নের পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীতে মাদকের সরবরাহ ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইয়াবার ‘হটস্পট’ মাদারবাড়ির এসআরবি স্টেশন নেপথ্যে জসিম-ঝুমকা বাদল সিন্ডিকেট