বান্দরবান বিক্ষত সড়কজুড়ে লাল নিশান পাহাড়ে ১৮০ কিলোমিটার সড়কে ক্ষতিগ্রস্ত
বিক্ষত সড়কজুড়ে লাল নিশান পাহাড়েবান্দরবানে সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া স্থানগুলোতে যানবাহন ও পথচারীদের সতর্ক করতে টাঙানো হয়েছে লাল নিশান। রবিবার রোয়াংছড়ি-রুমা সংযোগ সড়কের দেবতা পাহাড় ও খামতাং পাড়া এলাকায়। পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে পিচঢালা পথ। কিন্তু সেই সড়কজুড়ে এখন ছোট ছোট লাল নিশান।কোথাও সড়কের একাংশ ধসে গিয়ে সরু হয়ে গেছে, কোথাও পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও আবার পাহাড়ি ঢলে সড়কের পাশের মাটি সরে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভয়ঙ্কর খাদ। ঝুঁকিপূর্ণ এসব স্থানে সতর্কবার্তা হিসেবে টাঙানো হয়েছে বিপদের সংকেত হিসেবে লাল নিশান। দূর থেকে দেখলে এসব নিশান কেবল বিপজ্জনক অংশের সংকেত।কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে এগুলো এখন তার চেয়েও বড় কিছু বলে জানান রুমার সেপ্রুপাড়া কারবারি (পাড়াপ্রধান) হ্লাচিংউ মার্মা ও রোয়াংছড়ির রোনিনপাড়া কারবারি রামতিনখুপ বম। দুই পাড়াপ্রধান বলেন, এসব পতাকা যেন থমকে যাওয়া জীবন, আটকে থাকা কৃষিপণ্য, হাসপাতালে যেতে না পারা রোগী, স্কুলে যেতে দুর্ভোগে পড়া শিক্ষার্থী এবং পর্যটননির্ভর মানুষের আয়-উপার্জন হারানো প্রতীক।স্থানীয়রা বলেন, সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বাড়ে, জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। কোথাও পাহাড়ধস, কোথাও সড়কধসে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা।এখন পানি নেমে গেছে, কিন্তু ফসলি জমি, সবজি ক্ষেত, ফলের বাগান আর সড়কজুড়ে ধ্বংসের চিহ্ন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা জানান, ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ। সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়ায় অনেক জায়গায় মাঝারি ও ভারি যানবাহন চলতে পারছে না। ফলে সময়মতো কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া যাচ্ছে না। রোগী নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে।আরও পড়ুন, কৃষক কে বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগ, দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধনশিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতেও দেখা দিয়েছে দুর্ভোগ।ট্যুরিস্ট গাইডসহ পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে কমেছে পর্যটক। এতে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, পর্যটকবাহী গাড়ি ও ট্যুরিস্ট গাইডদের আয়ে ধস নেমেছে।সরেজমিন রবিবার ও সোমবার বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি ও রুমার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে ক্ষত এখনও স্পষ্ট। অনেক জায়গায় সড়কের দুই পাশের মাটি সরে গেছে। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও সড়কের একাংশ ধসে পড়েছে। ধসের কারণে কোথাও সড়ক এতটাই সরু হয়ে গেছে যে মুখোমুখি দুটি গাড়ি পার হওয়ার সুযোগ নেই। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে লাল নিশান টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিয়ে জানা গেছে, শুধু সদর, রোয়াংছড়ি ও রুমা নয়; থানছি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন সড়কও একইরকম ক্ষতিগ্রস্ত।রোয়াংছড়ি-কচ্ছপতলী সড়কের কচ্ছপতলী পাড়ার বাসিন্দা মংপ্রু মারমা বলেন, এবারের বন্যায় খালপারের সড়কের বেশ কিছু অংশ ধসে গেছে। এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে। সড়কটি দ্রুত সংস্কার না হলে দুর্ভোগ আরো বাড়বে।রোয়াংছড়ি ও রুমার বাসিন্দারা বলেন, পাহাড়ে একটি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে শুধু যানবাহন চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হওয়া নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকা। যে সড়ক দিয়ে কৃষক তার ফলের বাগানে যান, একই সড়ক দিয়ে উৎপাদিত পণ্য বাজারে আসে। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যায়। পর্যটকরা পৌঁছান পাহাড়ের প্রত্যন্ত দর্শনীয় স্থানগুলোতে। সেই সড়কও যখন ভেঙে যায়, তখন একসঙ্গে থমকে যায় এসব কার্যক্রমপাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা বলেন, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে জরুরি সেবায়। দুর্গম এলাকার কোনো মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বড় যানবাহন চলতে না পারায় রোগী পরিবহন হয়ে পড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মায়াং ম্রো প্রদীপ বলেন, সড়কের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। কোনোভাবে মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারলেও মাঝারি বা বড় গাড়ি চলতে পারছে না। এতে স্থানীয়দের অনেক ভোগান্তি হচ্ছে। দ্রুত সড়ক মেরামত করে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।আরও পড়ুন, ওসি শাহিনুর আলমের নেতৃত্বে শ্রীপুরে ৭,৭৯০ পিস ইয়াবা উদ্ধার, আটক ১বান্দরবান হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিধি-নিষেধের কারণে জেলার হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট-কটেজ খাতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এছাড়া রেস্টুরেন্ট, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প, বিভিন্ন পণ্য ব্যবসা ও পরিবহনসহ পর্যটন খাতের হিসাব করলে চলতি বর্ষায় জেলার পর্যটননির্ভর বিভিন্ন সেক্টরে ৬০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রায় ১৮০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে তিনটি সরকারি দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী প্রয়োজন প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা।সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কের একটি বেইলি সেতু ধসসহ নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর-কক্সবাজার অভ্যন্তরীণ সড়কের প্রায় ৬৩ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন রুমা-রোয়াংছড়ি-কচ্ছপতলী, সুয়ালক-সরই এবং ব্রিকফিল্ড বাজার-চিম্বুক সড়কসহ প্রায় ৯০ কিলোমিটার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হেড অফিসে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রায় ২৫ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন ইয়াছির আরাফাত।