সরকারি আশ্রয়, কিন্তু নেই নিরাপত্তা বর্ষায় জলাবদ্ধতায় মানবেতর জীবন
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজারো ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের ধনকীপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। মাথা গোঁজার একটি ঘর থাকলেও নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানবিক পরিবেশের অভাবে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন এখানকার বাসিন্দারা। বর্ষা এলেই প্রকল্পজুড়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই পানিতে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা, আর সেই পানির মধ্যেই দিন কাটাতে হয় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের।সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের ধনকীপাড়া এলাকায় মূল সড়কের পাশেই ১৬টি পরিবারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি। তবে প্রকল্পের জমি সড়কের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার ফুট নিচু হওয়ায় বৃষ্টির পানি বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে ১৬টি ঘরের মধ্যে ১৪টি পরিবার নিয়মিত বসবাস করছে। বাকি দুটি পরিবারের সদস্যরা জীবিকার তাগিদে ঢাকায় অবস্থান করছেন।প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে চারদিকে জমে থাকা ময়লা পানি। বসতঘরের সামনের আঙিনা, রান্নাঘর, টয়লেট, টিউবওয়েলের চারপাশ—সবখানেই পানি থইথই করছে। কয়েকটি ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। দরজা-জানালার অনেকগুলোই নড়বড়ে হয়ে গেছে। রান্নার চুলার চারপাশে পানি জমে থাকায় অনেক পরিবার পানির মধ্যেই রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুদেরও প্রতিদিন সেই পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।আরও পড়ুন, ফরিদপুরে সমাজসেবা হোমের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ধ'র্ষণের শিকার, অন্তঃস'ত্ত্বা অভিযুক্ত গ্রেপ্তারপ্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, সামান্য বৃষ্টির পরও কয়েকদিন ধরে পানি নেমে যায় না। ফলে রান্না করা, টয়লেট ব্যবহার করা কিংবা বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ—সবকিছুই হয়ে পড়ে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন।এক বৃদ্ধা বাসিন্দা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা কি মানুষ না? সরকার ঘর দিয়েছে, কিন্তু এই কষ্টের মধ্যে কেন রাখলো? একটু মাটি ভরাট করে দিলেই তো পানি জমতো না। বৃষ্টি হলেই চারদিকে পানি। টয়লেটে যেতে পারি না, বিশুদ্ধ পানি পাই না। কেউ আমাদের খবরও নেয় না। আমরা বেঁচে আছি না মরে আছি—সেটাও যেন কেউ দেখতে আসে না।”আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমরা গরিব বলে কি মানুষ না? কতবার সমস্যার কথা বলেছি, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের কেউ নিয়মিত খোঁজ নেন না।”স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পটি নির্মাণের শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। কয়েকটি ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। দরজা-জানালার অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। বর্ষাকালে এসব সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।সরেজমিনে দেখা যায়, টিউবওয়েলের চারপাশেও পানি জমে থাকায় বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এতে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সারাক্ষণ পানির মধ্যে চলাচল করায় শিশুদের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ময়লা পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে।আরও পড়ুন, গাজীপুরকে নিরাপদ করতে ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প: এআই ও স্মার্ট প্রযুক্তির নজরদারিতে আসছে মহানগরপ্রকল্পে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবার দিনমজুরি, অস্থায়ী শ্রম কিংবা ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। টানা বৃষ্টিতে কাজে যেতে না পারলে পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। অনেক পরিবার অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে দিন কাটানোর কথাও জানিয়েছেন। এছাড়া প্রকল্পে বসবাসকারী এক অসুস্থ ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না বলেও জানান স্থানীয়রা।বাসিন্দাদের দাবি, পুরো প্রকল্পের জমিতে প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট করে উঁচু করা এবং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হলে দীর্ঘদিনের এই জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকটাই দূর হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার কথা জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের সময় ভূমির উচ্চতা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা হলে আজ এসব পরিবারকে এমন দুর্ভোগে পড়তে হতো না। এখন প্রয়োজন প্রকল্পটির কারিগরি ত্রুটি চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার, জমি ভরাট, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর মেরামত।এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, “বিষয়টি স্থানীয় চেয়ারম্যানকে জানানো হয়েছে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাবেন। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি প্রকল্পের জমি ভরাটের বিষয়টিও পরবর্তী উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে।”আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু একটি ঘর নির্মাণ নয়; বরং ভূমিহীন মানুষের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ বসবাস নিশ্চিত করা। কিন্তু ধনকীপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সেই লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বর্ষার প্রতিটি বৃষ্টি এখানকার বাসিন্দাদের জন্য নতুন করে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের প্রত্যাশা—দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এই প্রকল্পকে সত্যিকার অর্থেই বাসযোগ্য করে তোলা হবে, যাতে তারাও অন্য সবার মতো নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারেন।