দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

হামলা-হয়রানিতে চ্যালেঞ্জে পুলিশ

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা| একটি দেশের নাগরিক নিরাপদে চলাফেরা করবে, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করবে, বিনিয়োগ করবে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে এর পূর্বশর্ত হচ্ছে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা| আর সেই দায়িত্ব পালনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পুলিশ| অপরাধ দমন, আইন প্রয়োগ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর ওপরই বর্তায়| তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা আলোচনায় এসেছে| কোথাও অভিযানে বাধা, কোথাও থানা বা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ, কোথাও সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের কথা উঠে এসেছে| এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা ˆতরি হয়েছে|আরও পড়ুন:  পুলিশ সংস্কার কতদূর, কী ভাবছে সাধারণ মানুষ?নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিকভাবে বাধার মুখে পড়ে, তাহলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ˆতরি হতে পারে| তবে প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ|বাংলাদেশ পুলিশ শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার বা মামলা তদন্তই করে না; জনসমাবেশে নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসবাদ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ তদন্ত, দুর্যোগকালে উদ্ধারকাজসহ বহু দায়িত্ব পালন করে| একজন পুলিশ সদস্যকে প্রায়ই দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয়| ঈদ, পূজা, নির্বাচন, জাতীয় অনুষ্ঠান কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সব ক্ষেত্রেই পুলিশকে সামনের সারিতে থাকতে হয়| ফলে বাহিনীটির ওপর দায়িত্বের চাপও তুলনামূলক বেশি|আরও পড়ুন:  গুলশান পুলিশকে বিতর্কিত করতেই মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারমাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় তারা স্থানীয় প্রতিরোধ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ কিংবা উত্তেজিত জনতার প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন| তবে এসব অভিজ্ঞতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব প্রেক্ষাপট রয়েছে|কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত হলে দায়িত্ব পালন আরও কার্যকর হবে| অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ| বিগত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা, পুলিশ ফাঁড়ি বা টহলরত সদস্যদের ওপর হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে| কোথাও ভাঙচুর, কোথাও সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, আবার কোথাও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন|নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনা শুধু পুলিশের জন্য নয়, রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগের বিষয়| তারা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি|আরও পড়ুন: আলোচনা, সমালোচনা আর দায়িত্বের গল্প: ওসি দাউদদায়িত্ব পালনের সময় কোনো সিদ্ধান্ত পরে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে| এমন আশঙ্কাও কিছু পুলিশ সদস্যের মধ্যে কাজ করে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে| ফলে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় লাগতে পারে| বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত সুরক্ষা থাকতে হবে, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের ব্যবস্থাও থাকতে হবে|অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, যখন আইন প্রয়োগের গতি মন্থর হয় বা বাহিনী চাপে থাকে, তখন সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে| মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের মতো ক্ষেত্রগুলোতে কার্যকর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ| তবে কোনো নির্দিষ্ট কারণেই অপরাধ বাড়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান, বিচারিক তথ্য এবং গবেষণা একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন|আরও পড়ুন: ডিএমপির কয়েকটি থানায় দৃশ্যমান পরিবর্তনআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের ধারণা অনেক সময় বাস্তব অপরাধের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রচারিত ঘটনা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপরও নির্ভর করে| ফলে জনমনে নিরাপত্তাবোধ বজায় রাখতে শুধু অপরাধ দমন নয়, কার্যকর যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ| সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে অপরাধের বিচার হবে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পায়|বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়| বিশেষজ্ঞরা বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অযাচিত প্রভাবের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা উচিত| তাদের মতে, পেশাদার পুলিশিং নিশ্চিত করতে আইনের শাসন, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহি এই তিনটি বিষয় অপরিহার্য| বর্তমানে শুধু প্রচলিত অপরাধ নয়, সাইবার জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের মতো নতুন চ্যালেঞ্জও পুলিশের সামনে এসেছে|আরও পড়ুন:  প্রশংসা-সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা ওসি দাউদবিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অপরাধ মোকাবিলায় উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন| একটি বাহিনীর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার সদস্যদের মনোবলের ওপর| কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, স্বীকৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা মনোবল বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে| অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আইনগত সুরক্ষা, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, আধুনিক প্রযুক্তি এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকলে বাহিনীর দক্ষতা আরও বাড়তে পারে|বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু পুলিশ নয়, সাধারণ জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে আইন মেনে চলা এবং অপরাধ দমনে সহযোগিতা করা| সন্দেহজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, গুজব না ছড়ানো এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া এসব বিষয়ও জননিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত| কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণ ও পুলিশের মধ্যে আস্থা বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা|আরও পড়ুন:  অপরাধ দমনে নতুন ছকে ডিএমপিআইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়| সেখানে অপরাধী যেমন আইনের বাইরে থাকতে পারে না, তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন| তাদের মতে, দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি দুইয়ের সমম্মই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কার্যকর মডেল|জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, আন্তঃদেশীয় অপরাধ চক্র এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে পুলিশের দায়িত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা| এ কারণে এখন থেকেই আধুনিক পুলিশিং, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে|আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ| দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্বধীনতা এবং আইনসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার এবং জবাবদিহিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ|আরও পড়ুন:  আইনের শাসন না মবের রাজত্ব?পুলিশের ওপর হামলা, দায়িত্ব পালনে বাধা বা অযাচিত প্রভাবের যেকোনো অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন| একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইনের সীমার মধ্যে থেকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব| নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ সব পক্ষের সম্মতি ভূমিকা অপরিহার্য| আইনের শাসন, পেশাদার পুলিশিং, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা এই চারটি স্তম্ভের ওপরই একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব|

হামলা-হয়রানিতে চ্যালেঞ্জে পুলিশ