খালেদা জিয়ার আমলের নিরপেক্ষ প্রশাসন, নজর এখন তারেক রহমানের দিকে
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলে সমৃদ্ধির মহাসড়কে ছিলো নিরপক্ষ প্রশাসন। দেশ গঠনে উন্নয়ন এবং দেশের বেকার মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অনেক অবদান রেখে গেছেন। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৫-০৬ অর্থবছরে তিনি সর্বমোট ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা অনুমোদন করেছিলেন। ক্ষমতায় আসীন থাকা অবস্থায় এটিই ছিলো তার জীবনের শেষ উন্নয়নমূলক ব্যয়। খালেদা জিয়ার আমলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেছেন নিরপক্ষভাবে। প্রশাসনকে দলীয় কাজে ব্যবহার করেনি। তার ক্ষমতার আমলে বিভিন্ন খাতে ৮৪ লাখ মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছিলেন। দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি এই অর্থ অনুমোদন করেছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন কর্মসংস্থানে বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দায়িত্ব পালনের সময় প্রশাসনে পেয়েছেন সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) ও ইপিসিএস (ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস) অফিসারদের সহযোগিতা। দেশের প্রশাসন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন, বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলে, কিন্তু বাংলাদেশে এখন এই পদটি সরাসরি নেই, বরং বিসিএস ক্যাডারের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মে যোগদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন ও পরবর্তী সময়ে অনেক সাবেক সিএসপি অফিসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং নতুন স্বাধীন দেশে প্রশাসন গঠনে অবদান রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিএসপি ক্যাডার বিলুপ্ত হয়ে বাংলাদেশে নতুন সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থা চালু হয়। যা বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) নামে পরিচিত রয়েছে। খালেদা জিয়ার আমলে যেসব সিএসপি কর্মকর্তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে এম, কে, আনোয়ার, মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান, মোহাম্মদ আইয়ুবুর রহমান, সৈয়দ আহমেদ, ড. আকবর আলি খান, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ড.সা’দত হুসাইন, এ এস এম আব্দুল হালিম, মো. আবু সোলায়মান চৌধুরী এবং আলী ইমাম মজুমদার (বর্তমান উপদেষ্টা)। তবে খালেদা জিয়ার আমলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া প্রথা চালু করা হয়। আগামীর বাংলাদেশ গঠনে প্রশাসনের নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের নিয়ে দেশে পরিচালনা করতে হবে তারেক রহমানকে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করতে পারে সেকারণে বিএনপির প্রতি দেশের মানুষ অনেক কিছু প্রত্যাশা করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দক্ষতার সাথে প্রশাসন পরিচালনা করেছেন। ঠিক সেই ভাবে আগামীতে তাবেক রহমান সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এসব কারণ বিবেচনা করে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দৃষ্টি এখন তারেক রহমানের দিকে বলে মনে করছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আমলে দায়িত্ব পালন করা সাবেক পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা ইনকিলাবকে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দক্ষতার সাথে দেশে ও প্রশাসন পরিচালনা করেছেন। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাব ধীরে ধীরে বেড়েছে। প্রশাসন পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের পরামর্শের সঠিক থাকলে প্রশাসন ভালো থাকে। কিন্তু তারা হস্তক্ষেপ শুরু করলে সেটি ভালো না। সেটি তার আমলে হয়নি। বিএনপির আমলে সিএসপি অফিসারা ছিলেন এবং বিসিএস কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনে করেছেন, কাজও ভালো করেছেন। আগামীর বাংলাদেশ গঠনে তারেক রহমানকে নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রশাসনে সঠিক নেতৃত্ব ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা আওতায় আনলে দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হবে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারে। সেগুলো সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নজর দিতে হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক সমাপ্ত শেষে নতুন বার্তা দিয়ে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে পোস্ট দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার পোস্টটি নিচে হুবহু দেওয়া হলো। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্য তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক সমাপ্ত হয়েছে। এই সময় দেশজুড়ে এবং বিদেশে অবস্থানরত শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ভালোবাসা, সমবেদনা ও দোয়া আমাদের পরিবারকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই তিন দিনে আমরা আরও উপলব্ধি করেছি, আমার মা ভিন্ন-ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন-ভিন্ন তাৎপর্য বহন করতেন; অনেক ক্ষেত্রে তা ছিল এতটাই অর্থবহ, যা হয়তো আমরা নিজেরাও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন আপোষহীনতার প্রতীক; নিজের বিশ্বাসের পক্ষে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানোর অটল প্রেরণা। রাজনীতির ছাড়িয়ে এই প্রেরণা বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে; পরিচয়, আদর্শ ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে অগণিত মানুষকে স্পর্শ করেছে। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা পরিষদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। তাঁদের নেতৃত্ব ও দ্রুত সমন্বয়ের কারণেই স্বল্প সময়ের মধ্যে এই বিরল ও সম্মানজনক অন্তিম আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।আন্তর্জাতিক পরিম-লেও আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলো, দেশ-বিদেশের নেতা, কূটনীতিক এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের অংশীদারদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সহমর্মিতা ও সংহতি আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। জানাজায় বিভিন্ন দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি, সমবেদনার চিঠি ও বার্তা, শোক বইয়ে লেখা কথা, সামাজিক মাধ্যমে অগণিত অনুভূতির প্রকাশ, বাংলাদেশে অবস্থিত মিশন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি— এই প্রতিটি সম্মাননাই ছিল অভূতপূর্ব। আমি আবারও কৃতজ্ঞতা জানাই সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি সদস্যকে। মায়ের শেষ বিদায়ে আপনাদের দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জিয়া পরিবারকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।এই শোকের দিনগুলো যেন মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে সম্পন্ন হয়, সে জন্য যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সবার প্রতিই আমরা কৃতজ্ঞ। বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে। তাদের সম্মানসূচক গার্ড অব অনার ও শেষ সালাম আমার মায়ের জীবন ও অবদানের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। তাকে সমাধিতে পৌঁছে দিয়ে তারা জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন এবং অন্তিম যাত্রাকে প্রাপ্য সম্মানে আলোকিত করেছেন।আরও পড়ুন, রাষ্ট্রীয় শোক শেষে কৃতজ্ঞতা জানালেন তারেক রহমানএর আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে জনসভায় বলেছেন, বিএনপি আগামী দিনে জনগণের রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি আমার এবং বিএনপির পূর্ণ আস্থা ও সম্মান রয়েছে। বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় ১৬ নম্বর ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র বৃহৎ সকল জাতিগোষ্ঠীর সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ধর্ম-কাজের অধিকার, নাগরিক অধিকার, জীবন ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তাবিধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে। এটি আমাদের অঙ্গীকার। জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি অঙ্গীকার আমরা বাস্তবায়ন করব। বিএনপি ঘোষিত সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দেশের কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি আপনাদের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা চায়। আগামী প্রজন্মের রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বাবলম্বিতা এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আজকের এই সমাবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।জানা গেছে, গত ৪১ বছরের বেশি সময় ধরে বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খালেদা জিয়া। এর মধ্যে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যথাক্রমে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে কখনো কোনো নির্বাচনে হারেননি। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান হন। নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখার জন্য ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯ নম্বরে ছিলেন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময় ছিলো ফ্যাসিস্ট বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে। ওই সরকারের আমলে দুটি মামলায় কারাদ- দেওয়া হয় তাঁকে। দুই বছরের বেশি সময় কারাবন্দী রাখার পর ২০২০ সালে মার্চে করোনা মহামারির সময় তৎকালীন সরকার নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে তাঁকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়। প্রশাসন সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে, এটাই জনগণের প্রত্যাশা। জনগণ সুযোগ দিলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোরগ্যাংমুক্ত করে একটি নিরাপদ দেশ গড়ে তোলা হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম।বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমলাতন্ত্র আগে যে অবস্থায় ছিল, সচিবালয় থেকে শুরু করে সমস্ত প্রশাসনে একইভাবে ভূমিকা পালন করছে। এগুলো অতীত থেকেই এসেছে। সেগুলো পরিবর্তন এত অল্প সময়ে সম্ভবও নয়। নির্বাচন হলে যে সরকার আসবে, রাজনৈতিক কমিটমেন্ট পালন করতে তারা দায়বদ্ধ থাকবে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে খালেদা জিয়া একজন ‘ক্যারিশম্যাটিক’ নেত্রী। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে উঠে এলেও তিনি একজন দক্ষ শাসক হয়ে উঠেছিলেন।