সাতক্ষীরা পৌরসভা নির্বাচন আলোচনায় বিএনপির দুই প্রার্থীর মধ্যে মিঠু খান এগিয়ে
সাতক্ষীরা পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। বর্তমান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতি, অপরদিকে জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জেলা বিএনপির নেতা ও সাতক্ষীরা চেম্বার অফ কমার্স এর সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠুকে ঘিরে আলোচনা এখন তুঙ্গে।স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা পৌরসভায় বিএনপির দলীয় টিকিট যাবে কার হাতে—এ নিয়ে পৌরসভার রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভোট, জনসম্পৃক্ততা, জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।সাতক্ষীরা পৌরসভার সর্বশেষ প্রকাশ্য পৌর নির্বাচন ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, পৌরসভায় মোট ভোটার ছিলেন ৮৯ হাজার ২২৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪৩ হাজার ৪১৮ এবং নারী ৪৫ হাজার ৮০৬ জন। ওই নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৫৫ হাজার ৯২৬ জন।২০১৫ ও ২০২১ সালের ভোটের হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালের পৌর নির্বাচনে বিএনপির তাসকিন আহমেদ চিশতী ১৬ হাজার ৪৭০ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির শেখ আজহার হোসেন পেয়েছিলেন ১২ হাজার ৮৭৩ ভোট এবং নাসিম ফারুক খান মিঠু পেয়েছিলেন ১২,৫৩২ ভোট।অন্যদিকে ২০২১ সালের নির্বাচনে তাসকিন আহমেদ চিশতী আবারও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ২৫ হাজার ৮৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসিম ফারুক খান মিঠু পান ১৩ হাজার ২২১ ভোট, আওয়ামী লীগের শেখ নাসেরুল হক পান ১৩ হাজার ৫০ ভোট এবং জামায়াত-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উল্লেখিত মো. নুরুল হুদা পান ২ হাজার ৮৮৮ ভোট।আরও পড়ুন, ধামরাই সেন্ট্রাল প্রেস ক্লাবের বার্ষিক বনভোজন- ২০২৬ অনুষ্ঠিতআওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ভোটও হতে পারে এবারের পৌর নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ২০১৫ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শেখ আজহার হোসেনের পাওয়া ১২ হাজার ৮৭৩ ভোট এবং ২০২১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ নাসেরুল হকের পাওয়া ১৩ হাজার ৫০ ভোট-দুটি নির্বাচনের ফলাফলেই দেখা যায়, বিএনপির বাইরে থাকা বড় রাজনৈতিক ভোটভিত্তিগুলোও পৌরসভায় উল্লেখযোগ্য।তবে অতীতের এই ভোটগুলোকে বর্তমান সময়ে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘স্থায়ী ভোটব্যাংক’ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে, ভোটারের মনোভাবও পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে ২০২১ সালে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী না থাকায় ২০১৫ সালের জাতীয় পার্টির ১২ হাজার ৮৭৩ ভোট পরবর্তীতে কোথায় গেছে—এ বিষয়ে প্রকাশ্য ফলাফল থেকে নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।ব্যক্তিগত ভোট বনাম দলীয় ভোট এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন বাস্তবতায় আগের নির্বাচনের সমীকরণ হুবহু কার্যকর হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় পৌরসভায় বিএনপির নিজস্ব ভোট এবং জামায়াত-সমর্থিত ভোট নিয়ে বিভিন্ন আনুমানিক হিসাব সামনে আসছে। সেই অনুযায়ী ১২–১২.৫ হাজার জামায়াত-সমর্থিত ভোট বা ১০–১১ হাজার বিএনপির নিজস্ব ভোটের হিসাব শোনা যায়। তবে এটি কোনো সরকারি ভোটব্যাংক পরিসংখ্যান নয়—এগুলো স্থানীয় রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচ্য।এই পরিস্থিতিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি নিজস্ব ভোটের পরিধি, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, জনসম্পৃক্ততা এবং আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হতে পারে।এছাড়াও বিএনপির আর এক প্রার্থী তাসকিন আহমেদ চিশতীর ২০১৫ সালে তাঁর ভোট ছিল ১৬ হাজার ৪৭০; ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৮৮-এ।তবে এই ভোট বৃদ্ধির ব্যাখ্যা নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে রয়েছে ভিন্নমত। প্রচলিত আলোচনায় বলা হয়, শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিংবা দলীয় ভোটের ওপর নির্ভর করেই এই উত্থান ঘটেনি; জামায়াতের নির্বাচনী কৌশল ও ভোটের কৌশলগত অবস্থানও এতে ভূমিকা রেখেছিল—এমন দাবি রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনায় এমন কথাও শোনা যায়, জামায়াত মাঠে দৃশ্যমান প্রার্থী রাখলেও তাদের একটি অংশের ভোট ব্যতীত তাদের সমর্থিত সকল ভোট শেষ পর্যন্ত কৌশলগত কারণে ধানের শীষের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতেই ভোট ব্যাংকের এই উত্থান।আরও পড়ুন, ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে প্রসূতির মৃত্যুচলতি বছরে জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী আলহাজ্ব আব্দুর রউফের নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরেও পৌরসভা নির্বাচনেসাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সাতক্ষীরা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ্ব মো. আব্দুর রউফ এর নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-২ আসনে সাবেক মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতী ও তাঁর সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচারণায় নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে—যেটি প্রার্থীর পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। তাছাড়া চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণার পূর্বে তিনি নিজেও সদর দুই আসনে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাবী করেছিলেন।শেষ পর্যন্ত মনোনয়নে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে? তবে পৌরসভার নির্বাচনে সাতক্ষীরার সুশীল সমাজ মনে করে, বিএনপির সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে, দলীয় ভোটের বাইরে প্রার্থীর নিজস্ব ভোট কতটা? বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কতটা? আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সাবেক সমর্থকদের একটি অংশকে কি নতুন নির্বাচনী সমীকরণে যুক্ত করা সম্ভব? জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন বাস্তবতায় কোন প্রার্থীর সামাজিক ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা কতটা?এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে নাছিম ফারুক খান মিঠু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।তাই সাতক্ষীরা পৌরসভায় বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই এখন শুধু ‘কার দলীয় পরিচয় শক্তিশালী’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং কার ব্যক্তিগত ভোট কতটা, জনসম্পৃক্ততা কতটা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন শ্রেণির ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কতটা? সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সাবেক মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতি ও বিএনপির আর এক প্রভাবশালী নেতা নাসিম ফারুক খান মিঠুকে ঘিরে আলোচনা এখন তুঙ্গে।তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি বিএনপি শেষ পর্যন্ত নাসিম ফারুক খান মিঠুকে দলীয় মনোনয়ন দেয় এবং তিনি দলীয় ভোটের পাশাপাশি নির্দলীয়, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সমর্থকদের একটি অংশের ভোট আকর্ষণ করতে পারেন, তাহলে সাতক্ষীরা পৌরসভার মেয়র পদে তিনি শুধুমাত্র অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীই নন, সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারেন।