দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

ধানের ন্যায্যমূল্য নেই, চালের বাজারে দামের উত্তাপ

মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ। মাসের পর মাস রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফসল ফলিয়েছেন কৃষক। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি সব মিলিয়ে ধান উৎপাদনে বেড়েছে খরচ। কিন্তু সেই ধান যখন কৃষকের গোলায় বা উঠানে ওঠে, তখনই যেন তার দাম পড়ে যায় তলানিতে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষককে বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কেনা সেই ধান কয়েক হাত ঘুরে মিল-চাতালে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর চাল হিসেবে বাজারে উঠলেই চিত্র পাল্টে যায়। বাড়তে থাকে দাম। কৃষকের হাতে যে ধানের দাম কম, সেই ধান থেকে তৈরি চালের জন্য বাজারে গিয়ে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ফলে একই পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভোগের পর্যায়ে এসে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ধান কাটার মৌসুমে যখন বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধান ওঠে, তখন ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কেনার সুযোগ নেয়। অনেক কৃষকের হাতে ফসল ঘরে তোলার পরপরই নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি কিংবা পারিবারিক খরচ মেটাতে তাদের দ্রুত ধান বিক্রি করতে হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি শ্রেণি কৃষকের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে ধান কিনে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, তাদের হাতে দীর্ঘদিন ধান ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। ফলে বাজারদর বাড়ার অপেক্ষায় না থেকে অনেক সময় বাধ্য হয়েই ফসল বিক্রি করতে হয়। বিপরীতে যাদের বড় গুদাম বা সংরক্ষণ সুবিধা রয়েছে, তারা ধান মজুত করে পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রি করতে পারে। এতে কৃষক উৎপাদনের ঝুঁকি বহন করলেও বাজারের মূল নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।কৃষক ও ভোক্তাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কেনা ধান প্রক্রিয়াজাত হয়ে চাল হওয়ার পর দাম এতটা বাড়ে কেন? ধান থেকে চাল তৈরির ক্ষেত্রে মিলিং, পরিবহন, শ্রম, বিদ্যুৎ, সংরক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় রয়েছে এ কথা ঠিক। তবে কৃষক ও ভোক্তাদের অভিযোগ, এসব ব্যয়ের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আরও  পড়ুন, অনলাইন জুয়া ঠেকাতে গোপালগঞ্জে নগদ উদ্যোক্তাদের সচেতনতামূলক সভাকৃষকদের অভিযোগ, বড় ব্যবসায়ী, আড়তদার ও চালকল মালিকদের একটি অংশ বাজারের পরিস্থিতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কোথাও কোথাও সিন্ডিকেট করে ধান কেনা, মজুত ও চালের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কার্যকর তদন্ত ও বাজার মনিটরিং প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ধান-চালের যে দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল, তার প্রতিটি ধাপে মূল্য সংযোজনের পাশাপাশি বাড়তি মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কেনা ধান শেষ পর্যন্ত কয়েক ধাপ পেরিয়ে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর সময় তার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি কৃষক। কৃষকের ঘাম, শ্রম ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে দেশের কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যের জোগান। অথচ সেই কৃষকই নিজের উৎপাদিত ফসলের বাজারদর নির্ধারণে কার্যত অসহায়। কৃষকের অভিযোগ, তারা ধান বিক্রির সময় বাজারের ক্রেতা বা ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাজারে হাতে গোনা কয়েকজন ক্রেতা থাকলে প্রতিযোগিতামূলক দাম পাওয়ার সুযোগও কমে যায়। ফলে যে দামে ধান কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়, অনেক সময় সেই দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। এদিকে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার পর ব্যবসায়ীদের হাতে থাকে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সুযোগ। বাজারে সরবরাহ কমে গেলে কিংবা চাহিদা বাড়লে তারা তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। এর ফলে উৎপাদনের মূল ঝুঁকি কৃষকের, কিন্তু বাজারের লাভের বড় অংশ চলে যায় পরবর্তী পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের হাতে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।শুধু কৃষকই নন, চালের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপরও। নিম্নআয়ের মানুষের দৈনন্দিন খাবারের প্রধান অংশই চালনির্ভর। ফলে চালের দাম বাড়লে তাদের সংসার ব্যয়ের বড় একটি অংশ খাবারের পেছনে চলে যায়।মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের পাশাপাশি চালসহ খাদ্যপণ্যের বাড়তি দাম সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে অন্যান্য খরচ কমাতে হচ্ছে। ভোক্তাদের প্রশ্ন, কৃষক যখন তার উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, তখন বাজারে চালের দাম বাড়ছে কেন? উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কোথায় কতটা মূল্য বাড়ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

ধানের ন্যায্যমূল্য নেই, চালের বাজারে দামের উত্তাপ