দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

যে কণ্ঠ নিয়ে সমালোচনা, সেই কণ্ঠেই মাতিয়েছেন পাঁচ দশক

কপালে বড় টিপ, খোঁপায় ফুল, হাতে চুড়ি আর পরনে রঙিন শাড়ি মঞ্চে এমন সাজেই দর্শকদের মাতিয়ে তোলেন ভারতীয় সংগীতশিল্পী উষা উত্থুপ। তাঁর ভারী ও গভীর কণ্ঠস্বর অন্যদের চেয়ে আলাদা। ‘হরি ওম হরি’, ‘রাম্বা হো’ কিংবা ‘কোই ইয়াহাঁ নাচে নাচে’র মতো গান দিয়ে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে আসছেন তিনি। ৮ নভেম্বর উষা উত্থুপের জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর বয়স ৭৯ বছর। দীর্ঘ সংগীতজীবনে সাফল্য পেলেও তাঁর পথচলা সহজ ছিল না। কণ্ঠস্বর নিয়ে সমালোচনা, সংগীতের ক্লাস থেকে বাদ পড়া, নাইট ক্লাবে দর্শকদের কটূক্তি—সব বাধা পেরিয়ে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। ছোটবেলায় স্কুলের সংগীত শিক্ষক তাঁর কণ্ঠকে গানের দলের উপযোগী মনে করতেন না। একপর্যায়ে তাঁকে কোরাসের ক্লাস থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। গানের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছিল ত্রিভুজাকৃতির বাদ্যযন্ত্র ও ক্ল্যাপার বাজানোর দায়িত্ব। তবে রেডিও শুনে বিভিন্ন ধরনের গান শেখার পাশাপাশি পাশ্চাত্য সংগীত, জ্যাজ ও পপের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখেন তিনি। ১৯৬৯ সালে চেন্নাইয়ের ‘নাইন জেমস’ নাইট ক্লাবে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে পেশাদার সংগীতজীবন শুরু করেন উষা। পরে কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের বিখ্যাত ‘ট্রিঙ্কাস’ নাইট ক্লাবে গান গেয়ে পরিচিতি পান। শাড়ি পরা এবং প্রচলিত গায়িকাদের মতো মিষ্টি কণ্ঠ না হওয়ায় শুরুতে তাঁকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন কেউ কেউ।আরও পড়ুন,জেনেভা উৎসবে বিজয়ী বাংলাদেশি মিনিসিরিজ সামনের সারির দর্শকদের কেউ কেউ কটূক্তি করে বলেছিলেন, ‘এই আম্মা কী গাইবে!’ কিন্তু গান শুরু করার পর তাঁর কণ্ঠ ও পরিবেশনা দর্শকদের মন জয় করে নেয়। ১৯৭০ সালে ‘বম্বে টকিজ’ চলচ্চিত্রে ইংরেজি গান গেয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। পরের বছর দেব আনন্দের ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণ’ সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পান। ‘দম মারো দম’ গানটি প্রথমে তাঁকে গাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত গানটি গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। তবে হতাশ না হয়ে নিজের সংগীতযাত্রা এগিয়ে নেন উষা। আশির দশকে ডিস্কো ও পপসংগীতের জনপ্রিয়তার সময় ‘হরি ওম হরি’, ‘শান সে’, ‘ওয়ান টু চা চা চা’ ও ‘রাম্বা হো’র মতো গান তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। বাপ্পি লাহিড়ীর সুরেও একাধিক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন তিনি। কণ্ঠের পাশাপাশি তাঁর শাড়ি, বড় টিপ, ফুলের মালা ও চুড়ি হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র পরিচয়ের অংশ। পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী সাজের এই মেলবন্ধন তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। বাংলা গান ও কলকাতার সঙ্গেও রয়েছে তাঁর গভীর সম্পর্ক।  ১৯৭৮ সালে ‘আহা তুমি সুন্দরী কত কলকাতা’ গানটি রেকর্ড করেন তিনি। ১৯৮১ সালে একই নামে প্রকাশিত হয় তাঁর বাংলা অ্যালবাম। পরবর্তী সময়ে ‘বারান্দায় রোদ্দুর’ ও ‘কাঁদে শুধু মন’ গানের ইংরেজি সংস্করণেও কাজ করেন। ২০২২ সালে প্রকাশ করেন নতুন বাংলা গান ‘মন মানছে না আর’। বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালে ভারতের মাটিতে রুনা লায়লার সঙ্গে একই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন তিনি। বাংলাদেশের গীতিকার ইশতিয়াক আহমেদের লেখা একটি গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন এই শিল্পী।সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন উষা। ২০২৪ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত হন তিনি। এর আগে পেয়েছেন পদ্মশ্রী। দীর্ঘ সংগীতজীবনে নানা বাধা পেরিয়ে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা এই শিল্পী এখনো মঞ্চে সমান প্রাণবন্ত। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বামী জানি চাকো উত্থুপের মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিজীবনে বড় আঘাত হয়ে আসে।

যে কণ্ঠ নিয়ে সমালোচনা, সেই কণ্ঠেই মাতিয়েছেন পাঁচ দশক