বনানীতে মার্ভেল ইন-লাক্সারী গেস্ট হাউজ ঘিরে পুলিশের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর ২৭ নম্বর রোড। একদিকে বহুতল ভবন, করপোরেট অফিস ও অভিজাত আবাসিক স্থাপনা, অন্যদিকে এসব ভবনের আড়ালেই গড়ে উঠেছে নানা ধরনের গেস্ট হাউজ ও স্পা-কেন্দ্রিক ব্যবসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈধ আবাসিক সেবার আড়ালে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে নানা ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে মানব পাচারকারী দালাল চক্র, মাদক সরবরাহ, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং কথিত ‘স্পেশাল সার্ভিস’ ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।বনানীর ২৭ নম্বর রোডের মার্ভেল ইন ও একটি লাক্সারী গেস্ট হাউজ ঘিরে নতুন করে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের যাতায়াত রয়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।স্থানীয়দের অভিযোগ, গেস্ট হাউজ ও স্পা-কেন্দ্রিক একটি দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে তরুণ-তরুণীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে তরুণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।আরও পড়ুন: অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ খুলেই কথিত ‘সাংবাদিক’!অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরি, ভালো বেতন, মডেলিং, বিউটি সার্ভিস কিংবা বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের ঢাকায় আনা হয়। পরে তাদের একটি চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন। কারণ অভিযোগ সত্য হলে এর সঙ্গে শুধু গেস্ট হাউজ নয়, পরিবহন, দালাল, নিয়োগকারী এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত আরও অনেক ব্যক্তি জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে অপরিচিত ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ে। অনেক সময় স্বল্প সময়ের জন্য আসা-যাওয়া করা ব্যক্তিদের দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। গেস্ট হাউজগুলোকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসার অভিযোগও নতুন নয়। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহের জন্য কিছু দালাল ও বহিরাগত ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশে অবস্থান করে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করা হয় এবং গেস্ট হাউজের কক্ষগুলোকে কখনো কখনো মাদক সেবনের স্থান হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং পুলিশের আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিক হোটেল বা গেস্ট হাউজে অপরাধ সংঘটিত হলে শুধু প্রতিষ্ঠানটির মালিক নয়, ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিথি নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকাও তদন্ত করা জরুরি। এসব অভিযোগের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, বনানীর কিছু গেস্ট হাউজ ও স্পা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কথিত মাসোহারা নেওয়ার বিনিময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নীরবতা পালন করা হয়। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।আরও পড়ুন: গ্রাহকের অর্থ কোথায়? Divine Group-এর প্রকল্প ও সম্পদস্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় এসব প্রতিষ্ঠানে পুলিশের তৎপরতা দেখা গেলেও কথিত মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আবার অভিযান পরিচালনার আগেই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে খবর পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে প্রশ্ন উঠছে অভিযানের তথ্য আগে থেকেই ফাঁস হচ্ছে কি না, নাকি এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্তই হচ্ছে না?অভিযোগকারীদের দাবি, বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। এমনকি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণও পাঠানো হয়েছে বলে দাবি তাদের। এছাড়া তিনি ফোন ও রিসিভ করেন না। কিন্তু অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপরও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।এ বিষয়ে বনানী থানার বর্তমান ওসির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।আরও পড়ুন: বনানীতে ফের সক্রিয় অপরাধচক্র, পুলিশের মাসোহারাবনানীর ২৭ নম্বর রোডের মার্ভেল ইনকে ঘিরেও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড চলছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে স্থানীয়ভাবে পায়েলের নাম আলোচনায় রয়েছে। তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অতীতে গোপালগঞ্জসহ রাজধানীর গুলশান-বনানী এলাকায় তার প্রভাব ছিল। তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত কর্মকাণ্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমান কোনো অপরাধের সঙ্গে তাকে জড়ানো সমীচীন নয়। মার্ভেল ইন বা এর মালিকের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণে প্রয়োজন সরকারি নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত। অভিযোগের বিষয়ে পায়েল বা মার্ভেল ইন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে সেটিও প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।অন্যদিকে একই এলাকায় করিম ভিলায় অবস্থিত লাক্সারী গেস্ট হাউজের মালিকানা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। হান্নান, সাকিবসহ প্রায় ছয়জন মালিক রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে তাদের প্রকৃত মালিকানা, অংশীদারিত্ব ও ব্যবসায়িক কাঠামো যাচাই করতে প্রয়োজন কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, ভাড়ার চুক্তি এবং অন্যান্য সরকারি নথি। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো পুলিশ যদি তাদের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাতে চায়, তাহলে তাদের জানিয়ে আসতে হবে। বনানী থানার পুলিশ ভালোভাবেই জানে বলেও দাবি করেন তিনি। হান্নানের দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন এবং তাদের ব্যবসা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত।তার বক্তব্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে প্রতিষ্ঠানটি যদি বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে, তাহলে তার লাইসেন্স, নিবন্ধন, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ব্যবসার ধরন আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাচাই করা যেতে পারে।আরও পড়ুন: প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, আসছে নতুন নীতিমালাস্থানীয় সূত্রের দাবি, গেস্ট হাউজের নামে কিছু কক্ষে কথিত ‘স্পেশাল সার্ভিস’ দেওয়া হয়। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে নারী সরবরাহকারী দালাল এবং বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর সম্পৃক্ততার কথাও বলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ডিজিটাল ফরেনসিক, কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণ সমাজকে ঘিরে। তাদের মতে, বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় অপরাধী চক্র যদি গেস্ট হাউজ বা স্পা সেন্টারের আড়ালে সক্রিয় থাকে, তাহলে সহজেই তরুণদের এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার তরুণদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে পারে। পরিবারগুলোর মধ্যেও তৈরি হতে পারে নিরাপত্তাহীনতা।আরও পড়ুন: বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎঅপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত লাইসেন্স যাচাই, অতিথিদের পরিচয় যাচাই, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, মাদকবিরোধী অভিযান এবং দালাল চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।অভিযোগগুলো সত্য হলে এসব প্রতিষ্ঠানে শুধু কয়েকজন কর্মচারী নয়, একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্ক কাজ করতে পারে। সেই নেটওয়ার্কে দালাল, মাদক সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, অনলাইন যোগাযোগকারী এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা থাকতে পারে। তাই শুধু কোনো গেস্ট হাউজে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেই তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। কে অর্থের জোগান দেয়, কারা নারী বা গ্রাহক সরবরাহ করে, মাদক কোথা থেকে আসে, টাকা কার মাধ্যমে লেনদেন হয় এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি পেছন থেকে সহযোগিতা করছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।আরও পড়ুন: লোডশেডিংয়ে শীর্ষে ঢাকা, সন্ধ্যায় ৫৬৯ মেগাওয়াট ঘাটতির আশঙ্কাবনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আবাসিক ভবনে পরিচালিত গেস্ট হাউজগুলোর বৈধতা, ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা, অতিথি নিবন্ধন, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার এবং অন্যান্য আইনগত বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করলে তাদেরও নিরাপত্তা ও আইনগত সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অপরাধ পরিচালিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব।একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে কথিত মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ থাকলে তা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পৃথকভাবে তদন্ত করা উচিত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কারণ কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুরো বাহিনীকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগ উপেক্ষা করাও জনআস্থার জন্য ক্ষতিকর।বনানীর ২৭ নম্বর রোডে মার্ভেল ইন ও লাক্সারী গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আর শুধু স্থানীয় মানুষের আলোচনার বিষয় নয়, এগুলো আইনশৃঙ্খলা, তরুণ সমাজের নিরাপত্তা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মানব পাচার, মাদক ব্যবসা কিংবা যৌন শোষণের মতো অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার অভিযোগ মিথ্যা হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অভিযোগমুক্ত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।