দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

পূর্বের দায় বর্তমান প্রশাসনের ওপর চাপানোর চেষ্টা: খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদ

​খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ ‘মডার্ন ফুড স্টোরেজ ফেসিলিটিজ প্রজেক্ট’ (MFSP) বা আধুনিক খাদ্য গুদাম নির্মাণ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রকল্পটির নথিপত্র, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (IMED) প্রতিবেদন এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বকালের সময়রেখা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের অতীত ব্যর্থতা বা অনিয়মের অভিযোগের সাথে বর্তমান প্রশাসন বা বর্তমান খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মোঃ আব্দুল বারী’র কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই।​এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর সংবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।​এক দশকের স্থবিরতা ও অদূরদর্শী পরিকল্পনা (২০১৪-২০২৩)​নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে এই মেগা প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়। তবে বিগত সরকারের আমলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গুরুতর ত্রুটি এবং নকশাগত ভুলের কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘ ১০ বছর ধীরগতির শিকার হয়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত এর ভৌত অগ্রগতি ছিল মাত্র ৫০ শতাংশের নিচে। আইএমইডি-এর প্রতিবেদন অনুসারে: ভুল পরিকল্পনা: ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সাইলো নির্মাণের জন্য ২ কোটি টাকা ব্যয়ের পর জানা যায় সেখানে সাইলো করা সম্ভব নয়। ডিজিটালাইজেশনে বাধা: ২০২১ সালে ডিজিটাল খাদ্য মজুত মনিটরিংয়ের জন্য সফটওয়্যার ও এসএপি (SAP) লাইসেন্স জটিলতার কারণে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া কয়েক বছর পিছিয়ে যায়, যার দায় সম্পূর্ণ পূর্ববর্তী কর্তৃপক্ষের।আরও  পড়ুন ,রামিসা হত্যা মামলা: ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের জেল আপিল শুনানির প্রস্তুতি সম্পন্নসময়রেখার অসংগতি: অভিযোগের বাস্তবতা কতটুকু?​সাম্প্রতিক কিছু মহলে এই প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হলেও তথ্য-প্রমাণ ও সময়রেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।মডার্ন ফুড স্টোরেজ প্রকল্পের সূচনা হয় জানুয়ারি ২০১৪ ইং।প্রকল্পের মেয়াদ ও মূল কার্যক্রম সমাপ্ত হয় ডিসেম্বর ২০২৫ ইং।জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন হয় ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইং।মোঃ আব্দুল বারী কর্তৃক খাদ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২৫ মার্চ ২০২৬ ইং।অর্থ্যাৎ, প্রকল্পটির মেয়াদ ও মূল কার্যক্রম শেষ হওয়ার প্রায় তিন মাস পর বর্তমান খাদ্য প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, যে প্রকল্পের মেয়াদ কোনো ব্যক্তির দায়িত্ব গ্রহণের আগেই শেষ হয়ে গেছে, সেই প্রকল্প থেকে তাঁর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমানিত হয়। আরও পড়ুন , পাঁচদিন বজ্রসহ বৃষ্টিতে ভিজবে দেশ, কোথাও কোথাও ভারি বর্ষণের সম্ভাবনাঅর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, "যেকোনো গুরুতর আর্থিক বা প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্বকাল, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা এবং সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকা আইনি ও নৈতিকভাবে আবশ্যক। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধ্বংসস্তূপের দায় নতুন কোনো প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিপন্থী"।সংস্কারের ধারাবাহিকতা ও বর্তমান সরকারের পদক্ষেপঃ​২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসে। বর্তমান প্রশাসনের বয়স মাত্র ৫ মাস। এই স্বল্প সময়ে এক দশকের অনাচার ও ৮৬ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির দায় নতুন প্রশাসনের ওপর চাপানো বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।​প্রকৃতপক্ষে, ২০২৪ সালের শেষভাগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পটির গতি বৃদ্ধি পেয়ে অগ্রগতি ৮০ শতাংশের ওপরে উন্নীত হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সেই সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ইতোমধ্যে খাদ্য মজুত মনিটরিংয়ের জন্য অনলাইন সিস্টেম চালু এবং বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে শুল্ক হ্রাসের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার যে লক্ষ্য বর্তমান সরকার নির্ধারণ করেছে, খাদ্য নিরাপত্তা আধুনিকায়ন তারই একটি অংশ।খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তীব্র প্রতিবাদঃএদিকে সাপ্তাহিক ‘শীর্ষ কাগজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রকাশিত সংবাদটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর, ভিত্তিহীন এবং প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।​বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমান যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে আরও সতর্কতার সঙ্গে তথ্য যাচাই করে দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের জন্য সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।​সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একটি অদূরদর্শী ও বিগত আমলের স্থবির প্রকল্পকে যখন নতুন প্রশাসন গতিশীল করে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তখন গুজব বা অপপ্রচারের পরিবর্তে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটিত হওয়া জরুরি।

পূর্বের দায় বর্তমান প্রশাসনের ওপর চাপানোর চেষ্টা: খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদ