দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

দুই বছর পরও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ, ৬ মাসে হামলা ২৭১

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশ পুলিশ। অবকাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও স্থাপনাগুলো সংস্কার করে কার্যক্রম চালু হলেও মনোবল ও জনআস্থার সংকট এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে পুলিশের ওপর হামলা, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া এবং ‘মব’ তৈরি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পুলিশের ওপর ২৭১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে ৮৭০ বার। শুধু ২০২৫ সালেই পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ছিল ৬০১টি।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধী গ্রেপ্তার, অভিযান পরিচালনা কিংবা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন পুলিশ সদস্যরা। পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনতা, রাজনৈতিক পক্ষ, আসামির স্বজন ও সংঘবদ্ধ বিভিন্ন গোষ্ঠীও পুলিশের ওপর হামলায় জড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও ‘মব’ তৈরি করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া বা নিজেদের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।এমন পরিস্থিতির মধ্যে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা তদবিরকেও বাহিনীর বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন। গত বৃহস্পতিবার রাজারবাগে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভায় আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, অনেক পুলিশ সদস্য গত ১৭ বছর ধরে বঞ্চিত ছিলেন দাবি করে বিভিন্ন জায়গায় তদবির করছেন। তদবির করে ভালো পোস্টিং পাওয়া যায় না উল্লেখ করে তিনি মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অনৈতিক লেনদেন থেকে বিরত থাকারও নির্দেশনা দেন তিনি।আরও  পড়ুন, দুপুরের মধ্যে ঢাকাসহ ১৩ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাসগণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন, আবার অনেকের বিরুদ্ধে মামলা ও বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে এখনো নানা দুর্বলতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পুলিশ সংস্কারের জন্য কমিশন গঠনের আলোচনা থাকলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে পুলিশ এখনো পিছিয়ে আছে। নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও তাদের মূলধারার পুলিশিংয়ের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। আস্থার ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার কারণে শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ সুযোগে নতুন নতুন অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গণঅভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে ৪৬০টি পুলিশ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে ৫৮টি থানা ও ২৬টি ফাঁড়িসহ ২২৪টি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভাঙচুর করা হয় ৫৬টি থানা ও ২৪টি ফাঁড়িসহ ২৩৬টি স্থাপনায়। ওই সময় ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮টি গুলি লুট হয়। এর মধ্যে এখনো এক হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।আরও  পড়ুন, দুই-তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে: ববি হাজ্জাজক্ষতিগ্রস্ত থানা ও ফাঁড়িগুলো মেরামত করে কার্যক্রম চালু করা হলেও পুলিশ এখন যানবাহন সংকটেও ভুগছে বলে জানা গেছে।পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ কমিশন গঠন নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো দ্বিধা রয়েছে। মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে এবং পুলিশ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।সাম্প্রতিক সময়েও পুলিশের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর আদাবরে অভিযান চালাতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হামলায় থানার ওসি ও এক এসআই আহত হন। লালমনিরহাটের আদিতমারীতে শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক দুজনকে ছিনিয়ে নেওয়ার সময় স্থানীয়দের হামলায় এনডিসি, পুলিশ সদস্যসহ ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সরকারি ছয়টি গাড়ি।এর আগে কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যানবাহন আটককে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনাও ঘটে।পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হামলার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬০০টি হামলার ঘটনা ঘটলেও সাম্প্রতিক সময়ে হামলার বড় অংশই ঘটছে প্রকাশ্যে। আসামি ধরতে গেলে পুলিশকে ঘিরে ফেলা, অভিযানে বাধা, কুপিয়ে জখম, গুলি, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের মতো ঘটনা বাড়ছে।

দুই বছর পরও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ, ৬ মাসে হামলা ২৭১