আব্দুল্লাহপুরে রাহিমের দাপটে হোটেল সি-গাল ও রাজমনিতে নারী-মাদক সিন্ডিকেট
উত্তরা পশ্চিম থানাধীন আব্দুল্লাহপুরে দুটি আবাসিক হোটেলকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক ব্যবসা ও দালাল চক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের অভিযান হলেও কিছু সময় পরই পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে আসে বলে স্থানীয়দের দাবি। রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানাধীন আব্দুল্লাহপুর এলাকায় আবাসিক হোটেল সি-গাল ও রাজমনি ঘিরে নারী ও মাদক সিন্ডিকেট এবং দালাল চক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হোটেল দুটিতে নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হোটেল দুটির আশপাশে অপরিচিত মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। তাদের মধ্যে দালাল ও মাদক কারবারিদের উপস্থিতিও চোখে পড়ে বলে দাবি এলাকাবাসীর। হোটেল দুটির মালিক রাহিম নিজেও একজন মাদক সেবনকারী। তার দালাল চক্র ঘিরে আবাসিক হোটেল দুটিতে বেশ বেপারোয়া। অপরাধের মাত্রা ছাড়িয়ে আবাসিক হোটেল দুটি যেকোন মুহুর্তে ঘটতে পারে বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা।আরও পড়ুন: মালিবাগে ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’ ঘিরে অভিযোগঅভিযোগ রয়েছে, হোটেল দুটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষকে হোটেলে নিয়ে আসে। এ কাজে কয়েকজন দালাল সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। তারা রাস্তাঘাট, হোটেলের আশপাশ এবং বিভিন্ন পরিবহনকেন্দ্র থেকে সম্ভাব্য গ্রাহক সংগ্রহ করে হোটেলে নিয়ে যায়। এরপর হোটেলের নির্দিষ্ট কক্ষকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, শুধু অনৈতিক কর্মকাণ্ডই নয়, হোটেল দুটির আশপাশে মাদক কারবারিদের আনাগোনাও নিয়মিত। বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য সরবরাহ ও কেনাবেচায় একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সন্ধ্যার পর এলাকাটিতে সাধারণ মানুষের চলাচলেও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হোটেলগুলোতে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানের সময় কিছু লোককে আটক কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও অভিযান শেষ হওয়ার কিছু সময় পর পরিস্থিতি আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসে বলে তাদের দাবি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অভিযান পরিচালনার পরও কীভাবে একই ধরনের কর্মকাণ্ড আবার শুরু হয়?আরও পড়ুন: আব্দুল্লাহপুরের ‘গ্রীন গার্ডেন’: আবাসিক হোটেলের আড়ালে কী চলছে?স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের খবর আগে থেকেই কোনো কোনো মহলে পৌঁছে যায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হোটেলে পৌঁছানোর আগেই সংশ্লিষ্ট অনেকেই সরে পড়ার সুযোগ পায়। তবে এ ধরনের অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আব্দুল্লাহপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকায় আবাসিক হোটেলগুলোতে অতিথি নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোনো হোটেলে এসব ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে অপরাধী চক্র সহজেই সেটিকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের ভাষ্য, আব্দুল্লাহপুর এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা থাকায় কিছু অসাধু ব্যক্তি হোটেল ব্যবসার আড়ালে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ খোঁজে। এতে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী হোটেল মালিক ও ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে সত্যতা নিশ্চিত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।আরও পড়ুন: রাজধানীর রামপুরা থানাধীন মালিবাগে হোটেল সবুজ বাংলায় মাসুদের নারী বাণিজ্যআইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো আবাসিক হোটেলে মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও রয়েছে অতিথিদের পরিচয় যাচাই ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে হোটেল সি-গাল ও রাজমনির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। একইভাবে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্যও অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে নেওয়া প্রয়োজন।এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। হোটেল দুটিতে নিয়মিত নজরদারি, অতিথিদের পরিচয় যাচাই, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ এবং মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দালাল চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় অপরাধের অভিযোগ থাকলে কেবল অভিযান নয়, অপরাধের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, সরবরাহকারী, দালাল এবং পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা জরুরি। নেপথ্যের মূল হোতাদের আইনের আওতায় না আনলে অভিযানের পরও একই ধরনের কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।আরও পড়ুন: উত্তরায় পুলিশের নাকের ডগায় গ্রান্ড প্লাজায় সোহেলের অসামাজিক কার্যক্রমআব্দুল্লাহপুরের সি-গাল ও রাজমনি হোটেল ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে অভিযানের কিছু সময় পর কীভাবে একই অভিযোগ আবার সামনে আসে? এর পেছনে কারা রয়েছে, দালাল চক্র কীভাবে কাজ করছে এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে কারা জড়িত এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন ধারাবাহিক অনুসন্ধান ও কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ।