দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সাতক্ষীরায় সুপারির বাণিজ্য ২২ কোটি টাকার বেশি, বাড়ছে আবাদ ও কৃষকের আগ্রহ

সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে অর্থকরী ফসল হিসেবে সুপারি চাষের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ, দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া এবং বাজারে স্থায়ী চাহিদা থাকায় জেলার কৃষকরা ধান, পান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি সুপারি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বাড়ির বসতভিটা থেকে শুরু করে কৃষিজমির আইল ও বিভিন্ন ফসলের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবেও লাগানো হচ্ছে সুপারি গাছ। কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলায় বছরে প্রায় ৫০০ টন সুপারি উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ২০ থেকে ২২ কোটি টাকারও বেশি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে সাতক্ষীরায় সুপারি আবাদের জমি বেড়েছে প্রায় ২৫০ বিঘা। ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ১৫০ বিঘা জমিতে সুপারি আবাদ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০০ বিঘায়। এ জমি থেকে চলতি মৌসুমে প্রায় ৪৫০ টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছে বলে কৃষি বিভাগের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বাজারদর বিবেচনায় সুপারি এখন জেলার কৃষকদের জন্য সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। বর্তমানে শুকনা সুপারি কেজিপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ হিসাবে ৫০০ টন সুপারির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ফলে স্বল্প পরিসরে উৎপাদিত হলেও স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে সুপারির অবদান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তালা উপজেলার কুমিরা গ্রামের কৃষক অরবিন্দু কুমার সংবাদ দিগন্তকে জানান, তাঁর তিন বিঘা জমিতে সুপারি বাগান রয়েছে। নারকেলসহ অন্যান্য গাছের সঙ্গে মিশ্রভাবে সুপারি গাছ লাগিয়েছেন তিনি। আরও পড়ুন, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডোবায় বাস নিহত ২এসব গাছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বছরে তাঁর বাগান থেকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার সুপারি বিক্রি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই সুপারি পেড়ে পাইকারি দরে কিনে নিয়ে যান। তাঁর গ্রামের অনেক কৃষক পানবরজের পাশাপাশি সুপারি বাগানও গড়ে তুলেছেন। সুপারির বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা বাজার। সপ্তাহে মঙ্গলবার ও শুক্রবার বসে এ বাজারের হাট। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখানে সুপারি নিয়ে আসেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পাশের যশোর ও খুলনা জেলার পাইকাররাও এ বাজার থেকে সুপারি সংগ্রহ করেন। পাটকেলঘাটা বাজারের সুপারি আড়তদার হযরত আলী সংবাদ দিগন্তকে জানান, প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার ও শুক্রবার তাঁর আড়তে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সুপারি বেচাকেনা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা সুপারি ও পান কেনার জন্য এ বাজারে আসেন। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাজারবাগান এলাকার সুপারি ব্যবসায়ী প্রণব চ্যাটার্জি সংবাদ দিগন্তকে বলেন, কাঁচা ও শুকনা দুই ধরনের সুপারিরই বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তিনি প্রতিদিন পান ও সুপারি বিক্রি করেন। প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার পাটকেলঘাটা বাজার থেকে পাইকারি দরে পান ও সুপারি কেনেন। বর্তমানে কাঁচা সুপারি প্রতি হাজার ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা এবং শুকনা সুপারি কেজিপ্রতি প্রায় ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ সংবাদ দিগন্তকে বলেন, পান ও সুপারি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। সাতক্ষীরায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুপারি উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে অনেকেই বাড়ির বসতভিটায় সুপারি বাগান করছেন। আবার কেউ কেউ বিভিন্ন ফসলের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবেও সুপারি চাষ করছেন।আরও পড়ুন, লালমনিরহাটে ট্রাক-অটোরিকশার সংঘর্ষে মাদ্রাসাছাত্র নিহত, আহত ৪সংশ্লিষ্টদের মতে, সুপারি চাষের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি ফলন এবং তুলনামূলক কম পরিচর্যা। একবার গাছ বড় হয়ে ফল দেওয়া শুরু করলে বহু বছর ধরে তা থেকে আয় করা সম্ভব। ফলে বসতভিটার অব্যবহৃত জায়গা ও অন্যান্য ফসলের সঙ্গে সুপারি গাছ লাগিয়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।  তবে এ খাতের সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে পরিকল্পিত বাগান স্থাপন, উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ও বাজারদরের নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সুপারি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি পাটকেলঘাটার মতো স্থানীয় পাইকারি বাজারগুলোকে আরও সংগঠিত করা গেলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও বৃহত্তর বাজারে সুপারি সরবরাহের সুযোগ পাবেন। উপকূলীয় সাতক্ষীরার মাটি ও আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে সুপারি চাষের যে বিস্তার ঘটছে, তা শুধু কৃষকের বাড়তি আয়ের পথই তৈরি করছে না; বরং গ্রামীণ কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি কৃষি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে সুপারি হয়ে উঠতে পারে সাতক্ষীরার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল।

সাতক্ষীরায় সুপারির বাণিজ্য ২২ কোটি টাকার বেশি, বাড়ছে আবাদ ও কৃষকের আগ্রহ