বৈচিত্র্যময় প্রতিমা, সম্প্রীতির বার্তা ও উৎসবের রঙে সাতক্ষীরা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে আনন্দ, আবেগ, বিশ্বাস ও উৎসবের রঙে সেজে ওঠে বাংলার জনপদ। শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। তবে দুর্গোৎসব কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলার সামাজিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প-সৃজনশীলতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনারও এক অনন্য প্রকাশ। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন দৃঢ় করার ক্ষেত্রে এ উৎসবের রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। সারাদেশের মতো সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরাতেও শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। এবার জেলার সাত উপজেলায় ৬১২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা আয়োজনের তথ্য দিয়েছে সাতক্ষীরা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ। অন্যদিকে, জেলা পুলিশের প্রাথমিক হিসাবে মণ্ডপের সংখ্যা ৬০৯টি। যাচাই-বাছাই শেষে এ সংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। সংখ্যাগত এ পার্থক্য নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন হলেও উৎসবকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ, প্রস্তুতি ও প্রত্যাশায় কোনো ঘাটতি নেই। এবারের দুর্গোৎসবের বিশেষ আকর্ষণ প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপসজ্জায় ব্যতিক্রমী উপকরণের ব্যবহার। দেশলাই কাঠি, রেশমি সুতা, মুগ ডাল, মুক্তা, সাদা তিল, চুমকি, পাট ও ফাইবারের মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রতিমা ও মণ্ডপের নান্দনিক সাজ। কোথাও তৈরি হচ্ছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা, কোথাও প্রতিমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ঝরনার পানি, আবার কোথাও কর্ণফুলী টানেলের আদলে নির্মিত পথ দিয়ে দর্শনার্থীরা প্রতিমা দর্শনের সুযোগ পাবেন। এসব আয়োজন সাতক্ষীরার দুর্গোৎসবকে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং স্থানীয় শিল্প, কারুশিল্প ও সৃজনশীলতার এক আকর্ষণীয় প্রদর্শনীতে পরিণত করেছে। সৃজনশীলতায় অনন্য সাতক্ষীরার পূজামণ্ডপ: সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ব্রহ্মরাজপুর সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দিরে প্রতিমার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। সূক্ষ্ম কারুকাজে প্রতিমাকে ভিন্নমাত্রা দিতে আয়োজকদের এ উদ্যোগ দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। গত বছর চিন্নিগুঁড়া চাল দিয়ে প্রতিমা সাজানোর পর এবার নতুন উপকরণে শিল্পকর্ম গড়ে তুলেছেন তাঁরা। আরোও পড়ুন,মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধ ভাবে ভারত যাওয়ার চেষ্টা,নারী শিশুসহ ৮ জন আটকএর মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয়, ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি শিল্পচর্চা ও নতুন কিছু সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাও দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে। আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা কাছারিপাড়া পূজামণ্ডপে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কেজি মুগ ডাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। একই উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তার কারুকাজে সাজানো হয়েছে ১৩টি প্রতিমা। অন্যদিকে, খাজরা ইউনিয়নের ঘুঘুমারি শুরেরাবাদ সার্বজনীন মন্দিরে ফাইবারের প্রতিমার ওপর দিয়ে ঝরনার পানি প্রবাহিত হওয়ার নান্দনিক আয়োজন করা হয়েছে। পানির সংস্পর্শেও প্রতিমাগুলো অক্ষত থাকছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কলারোয়ার মুরারীকাটি পালপাড়ার একটি মণ্ডপে প্রায় ২৫ কেজি সাদা তিল ব্যবহার করে ১৬টি প্রতিমা সাজানো হয়েছে। চার শিল্পী প্রায় ১৫ দিন ধরে পরিশ্রম করে এ কাজ সম্পন্ন করেছেন। একই এলাকার অন্য একটি মণ্ডপে প্রায় ১২ কেজি চুমকি দিয়ে প্রতিমার পোশাক ও অলংকারে আনা হয়েছে ঝলমলে নকশা। পাটকেলঘাটার একটি পূজামণ্ডপে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশ পাট ও পাটজাত উপকরণ ব্যবহার করে মণ্ডপসজ্জা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিমার সাজে ব্যবহৃত হচ্ছে রেশমি সুতা ও অন্যান্য উপকরণ। শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণ বড়কুপট নদীরপাড় দুর্গামন্দিরে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা। উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আরপাঙ্গাশিয়া রাসমন্দির প্রাঙ্গণে কর্ণফুলী টানেলের আদলে তৈরি করা হয়েছে একটি পথ, যার মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীরা প্রতিমা দর্শন করতে পারবেন। কালীগঞ্জ উপজেলার অমিয়ান বাথুয়াডাঙ্গা সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে ককশিট বা ফোমশিট দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগও এবারের উৎসবে বৈচিত্র্য যোগ করেছে।তালা উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপেও প্রতিমা নির্মাণে কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া ও বৈচিত্র্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। খড়, কাদামাটি, বাঁশসহ নানা উপকরণ ব্যবহার করে দেব-দেবীর রূপ ও পৌরাণিক কাহিনি ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীরা। দেবহাটা উপজেলার প্রতিমা নির্মাতারাও মাটির কাজ শেষে রং ও তুলির নিপুণ আঁচড়ে প্রতিমাগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসব উদ্যোগের পেছনে রয়েছে প্রতিমাশিল্পীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, শ্রম, ধৈর্য ও সৃজনশীলতা। প্রতিটি প্রতিমার পেছনে থাকে বহু দিনের পরিকল্পনা, উপকরণ সংগ্রহ এবং নিখুঁত কারুকাজের প্রচেষ্টা। ফলে দুর্গোৎসব স্থানীয় মৃৎশিল্পী, কারিগর, রংমিস্ত্রি, ডেকোরেটর ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে। এই শিল্প ও শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা গেলে উৎসবের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। আরোও পড়ুন,জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের উদ্যোগধর্মীয় উৎসব থেকে সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন: দুর্গোৎসবের মূল তাৎপর্য অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীকী বার্তার মধ্যে নিহিত। দেবী দুর্গার অসুরবধের পৌরাণিক কাহিনি মানুষকে অন্যায়, অবিচার, হিংসা ও অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক প্রেরণা দেয়। বর্তমান সমাজেও এ বার্তার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় দুর্গোৎসবের অন্তর্নিহিত শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।বাংলার ঐতিহ্যে ধর্মীয় উৎসবগুলো বহু ক্ষেত্রেই সামাজিক মিলনমেলার রূপ ধারণ করেছে। দুর্গাপূজার সময় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বন্ধুদের মিলন, নতুন পোশাক পরা, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নতুন করে প্রাণ পায়। সাতক্ষীরার মতো বহুধর্মীয় ও বৈচিত্র্যময় জনপদে এ উৎসব বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার রয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে পারে প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে পালনের সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে। একজন মানুষের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অধিকার সবার সমান। তাই দুর্গোৎসব শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আনন্দের বিষয় নয়; এটি সমাজের সব মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ প্রকাশেরও উপলক্ষ। অসাম্প্রদায়িকতা মানে কারও ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকে অন্যের বিশ্বাস ও অধিকারকে সম্মান করা। যে সমাজে ভিন্ন ধর্মের মানুষ পরস্পরের আনন্দে অংশ নিতে পারে, বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে অবজ্ঞা করে না, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সম্প্রীতির সমাজ। আরোও পড়ুন,জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের উদ্যোগদুর্গোৎসবের আনন্দকে এ মূল্যবোধের বিকাশে কাজে লাগানো প্রয়োজন।নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব: উৎসবের আনন্দ নির্বিঘ্ন রাখতে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ ইতিমধ্যে দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, মণ্ডপগুলোতে টহল, সিসিটিভি নজরদারি, সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকবে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে পূজারী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। মণ্ডপ কমিটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলো, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ, বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের সুবিধার দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে উত্তেজিত না হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, অন্যের বিশ্বাস নিয়ে বিদ্রূপ না করা এবং যেকোনো ধরনের উসকানি পরিহার করা উৎসবের পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ রাখতে সহায়ক হবে। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানিয়েছেন, এবার সাতক্ষীরার ৬১২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি মণ্ডপগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে পূজা আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জেলাবাসীকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন। পূজা উদযাপন পরিষদ ও পুলিশের দেওয়া মণ্ডপের সংখ্যায় আপাতত তিনটির পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের তথ্যগত অসামঞ্জস্য দ্রুত যাচাই করে সংশ্লিষ্ট তালিকা সমন্বয় করা প্রয়োজন। এতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা, জনবল বণ্টন ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার কাজ আরও কার্যকর হবে। উৎসব ব্যবস্থাপনায় নির্ভুল তথ্য ও আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংস্কৃতি, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা:আরোও পড়ুন,কোস্ট গার্ডের অভিযানে হরিণের মাংস, চামড়া ও মাথা উদ্ধারসাতক্ষীরার দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিমাশিল্প, মণ্ডপসজ্জা ও স্থানীয় ঐতিহ্যের যে বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে, তা সাংস্কৃতিক পর্যটনের সম্ভাবনাও তুলে ধরে। দেশলাই কাঠি, মুগ ডাল, মুক্তা, তিল কিংবা পাটের মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি শিল্পকর্ম দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে। পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব শিল্পকর্মের পরিচিতি জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা গেলে সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত পরিসরে পরিচিতি পাবে।এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারে। মণ্ডপের অবস্থান, যাতায়াতের পথ, দর্শনার্থীদের সুবিধা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য প্রচার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিমাশিল্পীদের কাজের স্বীকৃতি, তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।উৎসবকে কেন্দ্র করে পোশাক, খাবার, পরিবহন, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষও আয় করার সুযোগ পান। ফলে ধর্মীয় উৎসবের সামাজিক গুরুত্বের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তবে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা যেন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মর্যাদা, পরিবেশের ভারসাম্য কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল আলোকসজ্জা ও ব্যয়ের পরিমাণে নয়; বরং এর সুশৃঙ্খল আয়োজন, শিল্পমান, মানবিকতা ও সামাজিক অংশগ্রহণে নিহিত।সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়:একটি উৎসব তখনই সার্থক হয়ে ওঠে, যখন তার আনন্দ বৃহত্তর সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। দুর্গোৎসবের শিক্ষা যদি মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলে, তাহলে উৎসবের তাৎপর্য আরও গভীর হবে।আরোও পড়ুন,সীমান্তের ভেতরে পাহাড়ি এলাকায় মিলল ৪৮৪ পিস ভারতীয় শাড়িসাতক্ষীরার ৬১২টি পূজামণ্ডপকে ঘিরে যে আয়োজন, তা শুধু প্রতিমার বৈচিত্র্য কিংবা উৎসবের চাকচিক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। প্রতিটি মণ্ডপ হতে পারে মানবিকতা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার কেন্দ্র। পূজামণ্ডপে আগত দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া গেলে এ আয়োজনের সামাজিক মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। উৎসবের ইতিবাচক দিক, স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতা, সম্প্রীতির বাস্তব উদাহরণ এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার পাশাপাশি যেকোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার বিষয়ও দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করতে হবে। তথ্যের সত্যতা যাচাই, সংবেদনশীল বিষয়ে সতর্কতা এবং সব সম্প্রদায়ের মর্যাদা রক্ষা করে সংবাদ পরিবেশন জনমনে আস্থা তৈরিতে সহায়তা করবে। পরিশেষে বলা যায়, শারদীয় দুর্গোৎসব আনন্দের, আত্মশুদ্ধির, সৃজনশীলতার এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার উৎসব। সাতক্ষীরার বিভিন্ন মণ্ডপে ব্যতিক্রমী প্রতিমা ও নান্দনিক সাজসজ্জা মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ তৈরি করেছে, তা জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করছে। কিন্তু উৎসবের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন প্রতিটি মানুষ নির্বিঘ্নে নিজের ধর্ম পালন করতে পারবে, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিক মূল্যবোধ সবার—এই চেতনাকে ধারণ করেই সাতক্ষীরার শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠুক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা মানুষের মন থেকে দূর করুক হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন; প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও শুভবোধ। আনন্দময় ও শান্তিপূর্ণ দুর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে আরও সমৃদ্ধ হোক সাতক্ষীরা, আরও দৃঢ় হোক সম্প্রীতির বন্ধন, এগিয়ে যাক দেশ ও জাতি।