উজাড় হচ্ছে লামার সংরক্ষিত বন, রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ
বান্দরবানের লামা উপজেলার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল একসময় ছিল ঘন সবুজে আচ্ছাদিত| পাহাড়ের ঢালে সারি সারি গাছ, জীববৈচিত্রের সমৃদ্ধ আবাসস্থল এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চল আজ নানা কারণে সংকটের মুখে| স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত অবৈধ গাছ কাটা, জোত পারমিটের অপব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ কাঠ পাচারের কারণে প্রতিনিয়ত উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল| সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি অংশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই উঠেছে এসব অনিয়মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতার অভিযোগ|আরও পড়ুন: প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমস্থানীয় বাসিন্দা, কাঠ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, লামা বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা এম কবির উদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এলাকায় কিছু অসাধু কাঠ ব্যবসায়ীকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে ওঠে| অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের মাধ্যমে জোত পারমিটের অপব্যবহার, অতিরিক্ত গাছ কাটা এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচারের সুযোগ ˆতরি করা হচ্ছে| তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা|স্থানীয়দের দাবি, বন সংরক্ষণ, অবৈধ গাছ কাটা প্রতিরোধ এবং সরকারি বনসম্পদ রক্ষার দায়িত্ব বন বিভাগের হলেও বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে| তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও বন বিভাগের একটি অংশের যোগসাজশে দিনের পর দিন নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে|অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটা, নতুন জোত সৃষ্টি কিংবা জোত বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও বাস্তবে বিভিন্ন কৌশলে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে| স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে নিয়ম ভেঙে জোত পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে এবং সেই পারমিট ব্যবহার করে অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে|আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে করণিক ভুলের স্বীকারোক্তি, তদন্তে কঠোর নির্দেশস্থানীয়দের অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বনজ সম্পদকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে| এর ফলে পাহাড়ি বনাঞ্চলে আগের তুলনায় অনেক বেশি গাছ নিধনের ঘটনা ঘটছে|আরও পড়ুন: একযোগে ৩৩ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল সরকারজোত পারমিট মূলত নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট পরিমাণ গাছ পরিবহনের অনুমোদন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা| কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে একটি পারমিট ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকা থেকে অতিরিক্ত গাছ পরিবহন করা হচ্ছে|নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, বন বিভাগ থেকে যতসংখ্যক জোত পারমিট ইস্যু করা হয়েছে, সেই হিসাব অনুযায়ী যে পরিমাণ কাঠ বাজারে আসার কথা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি কাঠ প্রতিদিন বিভিন্ন ডিপো ও বাজারে পৌঁছাচ্ছে| তার ভাষ্য, একটি ˆবধ পারমিট দেখিয়ে একাধিক বাগান কিংবা অন্য উৎসের গাছ পরিবহন করা হচ্ছে| ফলে কাগজে-কলমে ˆবধতা থাকলেও বাস্তবে অতিরিক্ত গাছ কাটা এবং পাচারের সুযোগ ˆতরি হচ্ছে|আরও পড়ুন: সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আবারও আদালতে শুনানিতিনি আরও বলেন, একবার কাঠ গাড়িতে উঠে ডিপো পার হয়ে গেলে পরে কোন কাঠ কোন জোতের সেটা প্রমাণ করা খুব কঠিন হয়ে যায়| এ সুযোগটাই কাজে লাগানো হয়| তার দাবি, বড় ব্যবসায়ীরা সাধারণত প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েন না| বরং ছোট ব্যবসায়ীদের কাঠ বেশি জব্দ হয়|এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, লামা বনাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঠ বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে| এসব কাঠের বাজারমূল্য লাখ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়| তাদের দাবি, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে কাঠ পরিবহনে সহযোগিতা করেন| ফলে নিয়মিতভাবে কাঠবোঝাই ট্রাক ও পিকআপ বিভিন্ন সড়ক দিয়ে বনাঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে|একাধিক বাসিন্দা বলেন, দূর থেকে পাহাড়গুলো এখনও সবুজ দেখালেও ভেতরে প্রবেশ করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়| বহু এলাকায় বড় বড় গাছ কেটে নেওয়ায় বনভূমির ভেতর ফাঁকা হয়ে গেছে| কোথাও কোথাও শুধু ছোট গাছ ও ঝোপঝাড় রয়ে গেছে|আরও পড়ুন: তারেক রহমানকে উরসুলা ফন ডের লায়েনের আমন্ত্রণস্থানীয় পরিবেশ সচেতনদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই লামার অনেক বনাঞ্চল পরিবেশগত ভারসাম্য হারাবে| এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি পাহাড় ধস, ভূমিক্ষয় ও জলবায়ু ঝুঁকিও বাড়বে|সম্প্রতি বনাঞ্চল থেকে কাঠ পরিবহনের সময় একটি ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে বিষয়টি| জানা গেছে, গত ২৩ জুন রূপসীপাড়া এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্পের সদস্যরা সন্দেহজনকভাবে কাঠবোঝাই দুটি গাড়ি আটক করেন| আটকের সময় সেনাসদস্যরা জোতের মালিক হিসেবে পরিচিত শফিককে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি দাবি করেন, কাঠগুলো তার নয়|আরও পড়ুন: শিশু ধর্ষণের ঘটনায় এক আসামির মৃত্যুদণ্ডশফিকের ভাষ্য অনুযায়ী, গাছগুলো জহির নামের আরেক ব্যক্তির| তিনি তার জোত পারমিট ব্যবহার করে রূপসীপাড়া এলাকা থেকে কাঠ গাড়িতে তুলেছেন| এই বক্তব্য সামনে আসার পর একটি পারমিট অন্য ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারেন কি না সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে আসে| বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে জব্দ হওয়া কাঠের ˆবধতা যাচাই করা হচ্ছে| সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বন আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে|সূত্র জানায়, জব্দকৃত কাঠের উৎস, পারমিটের ˆবধতা এবং পরিবহনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এসব বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে| ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত জোতের মালিক শফিক বলেন, নির্ধারিত ডিপো থেকে কাঠ লোড না করাটা তার ভুল হয়েছে| প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর লামা বন বিভাগের কার্যালয়ে বিভিন্ন কাঠ ব্যবসায়ীর যাতায়াত লক্ষ্য করা যায়| এসব ˆবঠকে কাঠ পরিবহনের অনুমতি, জোত পারমিট এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়|আরও পড়ুন: কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে নিহত বেড়ে ৯, টানা বৃষ্টিতে চরম ঝুঁকিযদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি| এসব ˆবঠককে ঘিরে নানা ধরনের প্রশ্ন ˆতরি হলেও বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি| তবে পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ি বন শুধু কাঠের উৎস নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা| নিয়মবহির্ভূত গাছ কাটার ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং বৃষ্টির সময় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে| এছাড়া বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়|আরও পড়ুন: খাগড়াছড়িতে সশস্ত্র হামলা: ৩ যুবককে গুলি করে হত্যা, থমথমে এলাকাস্থানীয়দের মতে, বন উজাড়ের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে লামার পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে| অতীতে বিভিন্ন সময় বন বিভাগের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত কিংবা দৃশ্যমান শাস্তির নজির খুব কম| বন রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হলে অবৈধ গাছ কাটা ও কাঠ পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে না| তারা অবৈধ জোত পারমিট ইস্যু, কাঠ পরিবহন এবং বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন| পাশাপাশি বনাঞ্চলে সেনাবাহিনী, বন বিভাগ ও প্রশাসনের যৌথ নজরদারি বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা|অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লামা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা এম কবির উদ্দিন বলেন, রূপসীপাড়া এলাকায় বন বিভাগের কোনো কাঠের ডিপো নেই| তার ভাষ্য, গাছ ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে গাড়িতে কাঠ তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন| পরে সেনাবাহিনী গাড়ি দুটি আটক করলে বন বিভাগকে জানানো হয় এবং বন বিভাগ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাঠ জব্দ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে|একজনের নামে ইস্যু করা জোত পারমিট অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যার নামে পারমিট ইস্যু করা হয়েছে কেবল তিনিই ওই জোতের কাঠ পরিবহনের অধিকারী| এছাড়া নির্ধারিত ডিপোতে বন বিভাগের সদস্যদের উপস্থিতিতেই কাঠ গাড়িতে তোলার নিয়ম রয়েছে| তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে অবৈধ জোত পারমিট প্রদান কিংবা অর্থের বিনিময়ে অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন|আরও পড়ুন: বনানীতে অপহরণের অভিযোগে চাঞ্চল্য তথ্য, উদ্ধার হল শিশুস্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগগুলো যেহেতু সরাসরি বন বিভাগের কার্যক্রম ও সরকারি সম্পদ রক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন| যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে| আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া উচিত| বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে ¯^চ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মিত নজরদারির কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা|