ইয়ারপুর ইউনিয়নের সচিব আফজালের দুর্নীতিতে লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে,,
সাভার উপজেলার ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ টাকার ঘুষ বাণিজ্য, দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার ঘুষ-দুর্নীতির কারণে সরকার লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
জানা যায়, এসব অভিযোগে এলাকাবাসী ও স্থানীয় সচেতন সমাজের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আফজাল হোসন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় দুর্নীতি ও অনিয়মের পথগুলো তার ভালোই চেনা-জানা। তাই, ঘুষ বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে আফজাল হোসেন একাধিক বাড়ি, ফøাট ও গাড়িসহ বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর নির্ধারণ যাচাই-বাছাই করলেই তার প্রমাণ মিলবে।
জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ইয়ারপুর ইউনিয়নের জিরাবো এলাকার দিয়াখালীর রপ্তানীমুখি সোয়েটার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘আনায়া সোয়েটার লিমিটেড’-এর ট্রেড লাইসেন্স নাবায়ন করা হয়।আরোও পড়ুন,পরকীয়ার জেরে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে খুন এ প্রতিষ্ঠানটি ৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের বলে জানা যায়। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে সরকারের খাতে ১% হিসেবে বাণিজ্যিক কর নিয়ে রাজস্ব আদায় দেখিয়েছে ৫ হাজার ২৩০ টাকা। এ প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে সরকারকে বাণিজ্যিক কর দেয়া হয়েছে ৫ হাজার টাকা, ট্রেড লাইসেন্স-এর বার্ষিক ফি ২০০ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ৩০ টাকা। বাকী ১৪ হাজার ৭৭০ টাকা প্রশাসনিক কর্মকর্তা আফজাল হোসেন পকেটস্থ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঐ একই দিন ইয়ারপুর ইউনিয়নের জিরাবো এলাকার গোমাইল উত্তরপাড়ার গার্মেন্টস এক্সসরিজ উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘কিন এক্সেসরিজ’-এর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি ১২ হাজার বর্গফুট আয়তনের বলে জানা যায়। এ প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে সরকারের খাতে ১%-এরও কম বাণিজ্যিক কর নির্ধারণ করে সরকারের রাজস্বখাতে ১০ হাজার ২৩০ টাকার রশিদ দেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকারকে বাণিজ্যিক কর দেয়া হয়েছে ১০,০০০ হাজার টাকা, ট্রেড লাইসেন্স-এর বার্ষিক ফি ২০০ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ৩০ টাকা। বাকী ৪৯ হাজার ৭৭০ টাকা প্রশাসনিক কর্মকর্তা আফজাল হোসেন পকেটস্থ করেছেন। এই একদিনেই মাত্র দু’টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৬৪ হাজার ৫৪০ টাকা অবৈধভাবে পকেটস্থ করেছেন। এভাবেই প্রতিদিন সরকারকে মোটা অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে নিজে হাজার হাজার টাকা পকেটস্থ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে একটি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে ৯০,০০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। গ্রাহকের কাছ থেকে ৯০,০০০ টাকা আদায় করা হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫,২৩০ টাকা। ‘ভার্চুয়াল বটমস লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির কাছ এই ৯০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছিল।
কোম্পানিটি আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার জামগড়ায় (প্লট নং-এস.এ-১৭৯, আর.এস-১৩৫৬) অবস্থিত। নথিপত্র অনুযায়ী ৯০ হাজার টাকা আদায়ের সেই রসিদে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি সিল ও স্ট্যাম্পের পাশাপাশি আদায়কারীর স্বাক্ষরও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ভাউচার নম্বরটি হলো ৯১২৩১ এবং তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০২৫।
নথিপত্রে আরও দেখা যায় ৯০,০০০ টাকা আদায়ের বিপরীতে কোম্পানিটিকে ৫,২৩০ টাকা মূল্যের একটি ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। লাইসেন্সটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ইস্যু করা। ট্রেড লাইসেন্স নম্বরটি হলো ০০৯৪০৮ এবং শনাক্তকরণ নম্বরটি হলো ২০১৯২৬১৭২২৩০০৯৪০৮। লাইসেন্সটির তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০২৫।
ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ধরণ হিসেবে “শতভাগ রপ্তানিমুখী ওভেন ও নিট গার্মেন্টস শিল্প”-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ, একই কোম্পানির কাছ থেকে ৯০,০০০ টাকা আদায়ের জন্য ইস্যু করা রসিদে অর্থ আদায়ের খাত হিসেবে ‘ভিটা কর’ (ঐড়সবংঃবধফ ঞধী)-এর উল্লেখ রয়েছে।
এই অসঙ্গতিটি প্রশ্ন তুলেছে কারণ কোম্পানিটিকে ১০০% রপ্তানিমুখী ওভেন ও নিট পোশাক শিল্পের জন্য ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, অথচ ৯০,০০০ টাকার রসিদে এই অর্থকে ‘হোমস্টেড ট্যাক্স’ (বসতভিটার কর) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরোও পড়ুন,কক্সবাজারে সদর পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১৮ জন গ্রেপ্তারসংগৃহীত ৯০,০০০ টাকার বিপরীতে মাত্র ৫,২৩০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ায় বাকি ৮৪,৭৭০ টাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আফজাল হোসেন নতুন ট্রেড লাইসেন্স করতে আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদ, নাগরিকত্ব সনদ থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
এছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি তার ব্যক্তিগত ড্রাইভার মো: মোফাজ্জল হোসেন-এর নামে ‘এবি বিল্ডার্স’ নামে একটি ঠিকারদারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স করেছেন। যার ট্রেড লাইসেন্স নং-০৩৫৮১৯, ঠিকানা: জামগড়া, জিরাবো, আশুলিয়, ঢাকা। এ লাইসেন্স দিয়ে তিনি ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদারী করেন। ‘এবি বিল্ডার্স’ গত অর্থ বছর এবং তার আগে কয়টি প্রকল্পের কাজ করেছে তা তদন্ত করলেই পাওয়া যাবে। এবি বিল্ডার্স যতোগুলে প্রকল্পের কাজ করেছে তার অধিকাংশই ভুয়া বলে জানা যায়। শুধু প্রকল্প বানিয়ে সরকারের অর্থ হাতিয়ে নেয়া।
তার সকল অপকর্মের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন, আনোয়ার ও মিরাজ নামে ২ জন ব্যক্তি। তারা তার ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগকৃত। তারা রীতিমতো ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদে অফিস করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।