ধর্মীয় পরিচয়ে বৌদ্ধ, তবে ভক্তি ও বিশ্বাসের টানে বাড়ির আঙিনায় আয়োজন করেছেন শারদীয় দুর্গাপূজা। খাগড়াছড়ি পৌর শহরের নারিকেল বাগান এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমা পরিবারের এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। এক বছর আগে পাওয়া দুর্গাপ্রতিমায় এবার পূজার্চনা চলছে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ আয়োজন। শহরের নারিকেল বাগান এলাকায় জুমলাইন দোকানের পেছনে রিটন চাকমা ও সুপ্তা চাকমা দম্পতির বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী ‘দুর্গেশ্বরী মন্দির’। পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে আয়োজিত এ পূজায় সহযোগিতা করছেন স্থানীয় হিন্দু বাঙালিরা। পূজা উদ্যাপন কমিটির তালিকায় মন্দিরটি এবার সাত নম্বরে স্থান পেয়েছে। আয়োজকদের দাবি, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন ও সেনা জোন থেকেও মন্দিরের জন্য অনুদান দেওয়া হয়েছে। সুপ্তা চাকমা বলেন, “ধর্ম মানুষকে ভেদাভেদ করে না, বরং শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে। বৌদ্ধরা দুর্গাপূজা করতে পারবে না, এমন কথা কোথাও লেখা নেই। আমরা দুর্গাপূজা করলেও বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করছি না।” মণ্ডপে পৌরোহিত্য করছেন গঞ্জপাড়া শ্মশান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা সমীর আচার্য। শহরের আনন্দনগর এলাকার বাসিন্দা জুয়েল দে প্রতিমাটি দান করেছেন। যেভাবে শুরু এই ব্যতিক্রমী আয়োজন পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে সুপ্তা চাকমা ও সবিতা চাকমার জেঠাতো ভাইয়ের ছেলে নিত্য চাকমাকে ঘিরে দেবী দুর্গার ‘ভর’ হওয়ার ঘটনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়। নিত্য বর্তমানে পুলিশ লাইন্স স্কুলে নবম শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগে পড়ছে। পরিবারের দাবি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সে কাদামাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করত এবং দেবীর মহিমা বর্ণনা করত। পিতৃহীন নিত্যর বাড়ি পাশের মহাজন পাড়ায়। তার ইচ্ছায় গত বছর ঘরোয়াভাবে দুর্গাপূজা শুরু করেন অভিভাবকেরা। তবে সামাজিক চাপের কারণে সেখানে পূজার আয়োজন প্রত্যাশিতভাবে করা সম্ভব হয়নি। পরে নিত্যর দুই পিসি সবিতা চাকমা ও সুপ্তা চাকমা নিজেদের নারিকেল বাগানের বাড়িতে এবার বড় পরিসরে পূজার আয়োজন করেন। সবিতা চাকমার দাবি,
আরোও পড়ুন,১০ বছরে ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, স্ত্রীকে হত্যার দায়ে আটক প্রবাসী স্বামী
নিত্যর ওপর দেবীর ভর হওয়ার ঘটনা দেখেই তাঁরা বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। সুপ্তা চাকমার ভাষ্য, নিত্য কখনো কখনো উপস্থিত না থেকেও বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে পারে। এসব ঘটনাকে তাঁরা দেবীর কৃপা হিসেবে দেখেন। নারিকেল আনতে গিয়ে ১০৮ পদ্মফুলের সন্ধান প্রতিমা দানকারী জুয়েল দে গত ১৭ অক্টোবরের একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। তাঁর দাবি, বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নিত্য তাঁকে ঘট বসানোর জন্য একটি নারিকেল বাজার থেকে এনে দিতে বলে। মোটরসাইকেলে ওঠার পর সেটি চলছিল না বলে দাবি করেন তিনি। পরে বাজারে গিয়ে একটি নারিকেল পান। জুয়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, নারিকেল কেনার সময় দোকানদার তাঁকে জানান, নিত্যর জন্য ১০৮টি পদ্মফুল আলাদা করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে পাঠাবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না। পরে জুয়েল নারিকেল ও পদ্মফুল নিয়ে নিত্যর কাছে পৌঁছালে নিত্য তাঁকে বলে, “আঙ্কেল, আমি জানতাম আপনি আসবেন।” ঘটনাটিকে পরিবারের সদস্যরা অলৌকিক বলে বিশ্বাস করলেও এর কোনো স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। মহাজন পাড়া রক্ষার দাবিও পরিবারের সবিতা চাকমা, সুপ্তা চাকমা ও বিমলা দেবী নাথের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মহাজন পাড়ায় সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটলেও নিত্যর অলৌকিক শক্তির কারণে এলাকাটি রক্ষা পেয়েছিল। তাঁদের এ দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, লাল-গেরুয়া বসনে দেবী দুর্গার প্রতিমার সামনে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছে নিত্য চাকমা। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতার মধ্যেও বিশ্বাস, পারিবারিক উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় আয়োজিত এ পূজা খাগড়াছড়ি শহরে ব্যতিক্রমী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
বিষয় : দুর্গাপূজা আঙিনা ধর্মীয়

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ধর্মীয় পরিচয়ে বৌদ্ধ, তবে ভক্তি ও বিশ্বাসের টানে বাড়ির আঙিনায় আয়োজন করেছেন শারদীয় দুর্গাপূজা। খাগড়াছড়ি পৌর শহরের নারিকেল বাগান এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমা পরিবারের এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। এক বছর আগে পাওয়া দুর্গাপ্রতিমায় এবার পূজার্চনা চলছে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ আয়োজন। শহরের নারিকেল বাগান এলাকায় জুমলাইন দোকানের পেছনে রিটন চাকমা ও সুপ্তা চাকমা দম্পতির বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী ‘দুর্গেশ্বরী মন্দির’। পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে আয়োজিত এ পূজায় সহযোগিতা করছেন স্থানীয় হিন্দু বাঙালিরা। পূজা উদ্যাপন কমিটির তালিকায় মন্দিরটি এবার সাত নম্বরে স্থান পেয়েছে। আয়োজকদের দাবি, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন ও সেনা জোন থেকেও মন্দিরের জন্য অনুদান দেওয়া হয়েছে। সুপ্তা চাকমা বলেন, “ধর্ম মানুষকে ভেদাভেদ করে না, বরং শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে। বৌদ্ধরা দুর্গাপূজা করতে পারবে না, এমন কথা কোথাও লেখা নেই। আমরা দুর্গাপূজা করলেও বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করছি না।” মণ্ডপে পৌরোহিত্য করছেন গঞ্জপাড়া শ্মশান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা সমীর আচার্য। শহরের আনন্দনগর এলাকার বাসিন্দা জুয়েল দে প্রতিমাটি দান করেছেন। যেভাবে শুরু এই ব্যতিক্রমী আয়োজন পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে সুপ্তা চাকমা ও সবিতা চাকমার জেঠাতো ভাইয়ের ছেলে নিত্য চাকমাকে ঘিরে দেবী দুর্গার ‘ভর’ হওয়ার ঘটনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়। নিত্য বর্তমানে পুলিশ লাইন্স স্কুলে নবম শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগে পড়ছে। পরিবারের দাবি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সে কাদামাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করত এবং দেবীর মহিমা বর্ণনা করত। পিতৃহীন নিত্যর বাড়ি পাশের মহাজন পাড়ায়। তার ইচ্ছায় গত বছর ঘরোয়াভাবে দুর্গাপূজা শুরু করেন অভিভাবকেরা। তবে সামাজিক চাপের কারণে সেখানে পূজার আয়োজন প্রত্যাশিতভাবে করা সম্ভব হয়নি। পরে নিত্যর দুই পিসি সবিতা চাকমা ও সুপ্তা চাকমা নিজেদের নারিকেল বাগানের বাড়িতে এবার বড় পরিসরে পূজার আয়োজন করেন। সবিতা চাকমার দাবি,
আরোও পড়ুন,১০ বছরে ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, স্ত্রীকে হত্যার দায়ে আটক প্রবাসী স্বামী
নিত্যর ওপর দেবীর ভর হওয়ার ঘটনা দেখেই তাঁরা বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। সুপ্তা চাকমার ভাষ্য, নিত্য কখনো কখনো উপস্থিত না থেকেও বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে পারে। এসব ঘটনাকে তাঁরা দেবীর কৃপা হিসেবে দেখেন। নারিকেল আনতে গিয়ে ১০৮ পদ্মফুলের সন্ধান প্রতিমা দানকারী জুয়েল দে গত ১৭ অক্টোবরের একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। তাঁর দাবি, বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নিত্য তাঁকে ঘট বসানোর জন্য একটি নারিকেল বাজার থেকে এনে দিতে বলে। মোটরসাইকেলে ওঠার পর সেটি চলছিল না বলে দাবি করেন তিনি। পরে বাজারে গিয়ে একটি নারিকেল পান। জুয়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, নারিকেল কেনার সময় দোকানদার তাঁকে জানান, নিত্যর জন্য ১০৮টি পদ্মফুল আলাদা করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে পাঠাবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না। পরে জুয়েল নারিকেল ও পদ্মফুল নিয়ে নিত্যর কাছে পৌঁছালে নিত্য তাঁকে বলে, “আঙ্কেল, আমি জানতাম আপনি আসবেন।” ঘটনাটিকে পরিবারের সদস্যরা অলৌকিক বলে বিশ্বাস করলেও এর কোনো স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। মহাজন পাড়া রক্ষার দাবিও পরিবারের সবিতা চাকমা, সুপ্তা চাকমা ও বিমলা দেবী নাথের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মহাজন পাড়ায় সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটলেও নিত্যর অলৌকিক শক্তির কারণে এলাকাটি রক্ষা পেয়েছিল। তাঁদের এ দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, লাল-গেরুয়া বসনে দেবী দুর্গার প্রতিমার সামনে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছে নিত্য চাকমা। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতার মধ্যেও বিশ্বাস, পারিবারিক উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় আয়োজিত এ পূজা খাগড়াছড়ি শহরে ব্যতিক্রমী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

আপনার মতামত লিখুন