প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
রিপন রুদ্র ||
দেশে একের পর এক পুলিশের ওপর হামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা, মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এবং মাদক কারবারের বিস্তার—সব মিলিয়ে জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা, মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের গতি এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত আইনি সেবা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধ আবাসিক হোটেল, অনুমোদনহীন স্পা সেন্টার, মাদক সংশ্লিষ্ট আস্তানা ও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত ও প্রতিরোধ করা না গেলে অপরাধীদের তৎপরতা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল। পুলিশ একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধী শনাক্ত, জননিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা, দায়িত্ব পালনে বাধা, বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশ কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে? অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, জনবল, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে? রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের আন্দোলন ও বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা এবং সংঘর্ষের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কোনো দাবি বা অধিকার আদায়ের আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও সেই আন্দোলনের আড়ালে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি সম্পদ ভাঙচুর কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পুলিশের দায়িত্ব পালনের সময় তাদের ওপর হামলা হলে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হয় না, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেসব অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান। পুলিশের ওপর হামলার বিচার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগেরও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ জবাবদিহি ও পেশাদারত্বের সমন্বয় ছাড়া একটি বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করা সম্ভব নয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় মব সহিংসতা ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। বিভিন্ন এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা, মারধর, ভাঙচুর, চাঁদাবাজি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও বিচারের দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আদালতের। জনতার হাতে বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের দ্রুত সাড়া, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষক, মাদক সরবরাহকারী এবং অপরাধে অর্থায়নকারীদের শনাক্ত করতে হবে। শুধু কয়েকজন কিশোরকে আটক করে অভিযান শেষ করলে সমস্যার মূল উৎপাটন হবে না। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস, স্পা সেন্টার এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে মাঝেমধ্যে নানা অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন, বৈধ ব্যবসায়িক কাগজপত্র কিংবা নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সংশ্লিষ্টতা, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে, তাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে কি না, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার কী, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর কি না এবং আবাসিক অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে তো? বিশেষ করে গুলশান ও বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস এবং স্পা সেন্টারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পুলিশ, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লে সেগুলো ফাইলবন্দি না রেখে তদন্তের অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সুনাম ও অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে।আরও পড়ুন, পুলিশের মাসোহারা বৈধ, সাংবাদিকের উপহার অপরাধ?মাদক অপরাধের বিস্তার শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে অনেক সময় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণকে বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাদক কারবারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সরবরাহের উৎস, পরিবহন নেটওয়ার্ক, অর্থের লেনদেন এবং পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। শুধু খুচরা পর্যায়ের কয়েকজন মাদক বিক্রেতাকে আটক করে অভিযান শেষ করলে বড় চক্রগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস, বিনোদনকেন্দ্র এবং সন্দেহজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনানুগভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা এলাকার বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ না তুলে প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করাই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। জনসাধারণের মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে থানায় গিয়ে প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধের তথ্য নিয়ে থানায় যোগাযোগ করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সরাসরি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। অবশ্য সব ক্ষেত্রে এমন আচরণ ঘটে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতা যদি কোনো নাগরিকের হয়ে থাকে, তাহলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। একজন নাগরিক যখন কোনো অপরাধের তথ্য নিয়ে থানায় যান, তখন তিনি দ্রুত সাড়া, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং আইনগত সহায়তা প্রত্যাশা করেন। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পর যদি তাঁকে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যোগাযোগ করতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের প্রতি তাঁর আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকা নয়, আইন ও বিধি অনুযায়ী নিজের এখতিয়ারের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাও তাঁর দায়িত্ব। কোনো অভিযোগ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পাঠানোর প্রয়োজন হলে সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় পাঠাতে হবে। কিন্তু সেই অজুহাতে জরুরি অপরাধের তথ্য গ্রহণ বা প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব করা উচিত নয়। বিশেষ করে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা কোনো ব্যক্তির তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। পুলিশের ওপর ধারাবাহিক হামলা এবং দায়িত্ব পালনে বাধার ঘটনা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়; পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং জনবান্ধব আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, জনবল এবং কার্যকর অপারেশনাল নির্দেশনা দিতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধ দমনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অযৌক্তিক চাপ বা বাধা থাকলে তা দূর করতে হবে। পুলিশকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে একজন কর্মকর্তা অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবেন। আবার কোনো পুলিশ সদস্য দায়িত্বে অবহেলা করলে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাঁকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাং, মাদক কারবার, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান জোরদার করতে হবে। রাজধানীর গুলশান, বনানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম যাচাইয়ে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর লাইসেন্স, নিবন্ধন, ভবনের ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করতে হবে। অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। অভিযোগ গ্রহণের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না—এসব বিষয়ে অভিযোগকারীকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানাতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সাধারণ মানুষ যদি অপরাধের তথ্য দিয়েও দ্রুত প্রতিকার না পান, তাহলে তাঁরা নিরাপত্তার জন্য কোথায় যাবেন? অপরাধীরা যদি পুলিশের ওপর হামলা করে পার পেয়ে যায়, সংঘবদ্ধভাবে জনজীবন অস্থির করে তোলে এবং বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হয়, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলার নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ কিংবা নির্বিচারে গ্রেপ্তার কোনো সমাধান হতে পারে না। অপরাধ দমন করতে হবে আইন মেনে, নিরপেক্ষভাবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের হলেও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সামগ্রিক দায়িত্ব। এ জন্য পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। অপরাধ দমনে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অপরাধের অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। জনগণ পুলিশের প্রতিপক্ষ নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনগণই পুলিশের সবচেয়ে বড় সহযোগী হতে পারে। তাই পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা জরুরি। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—পুলিশের ওপর হামলা, মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা প্রস্তুত? থানায় গিয়ে সাধারণ মানুষ কি সহজে আইনি সেবা পাবেন? গুলশান-বনানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অপরাধের অভিযোগগুলো কি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্য কিংবা আশ্বাসে নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপে। কারণ জননিরাপত্তা কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের অধিকার নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও আইনগত সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক করার মধ্য দিয়েই জনগণের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা সম্ভব।