প্রিন্ট এর তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬
চট্টগ্রাম বোর্ডে ১৫ বছরের সর্বনিম্ন পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে ৫২ শতাংশ
এম মিজানুর রহমান ||
ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম: উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে এক বছরের ব্যবধানে আরও পিছিয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। পাসের হার ও জিপিএ-৫ অর্জন উভয় ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার রেকর্ড হওয়ার পাশাপাশি এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। বোর্ডের এমন ফলাফল শিক্ষা ব্যবস্থার মান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষার বৈষম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট। সংখ্যাগতভাবে এই হ্রাস খুব বেশি না হলেও গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার হওয়ায় এবারের ফলাফল বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পাসের হারের তুলনায় জিপিএ-৫ অর্জনের চিত্র আরও হতাশাজনক। গত বছর এ বোর্ডে ৬ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ হাজার ৯২৯ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ১৬৮ জন বা প্রায় ৫২ শতাংশ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড প্রকাশিত ফলাফলে এসব তথ্য উঠে আসে। এ বছর বোর্ডের অধীনে ১১৪টি পরীক্ষাকেন্দ্রে ২৮০টি কলেজের মোট ৯৬ হাজার ৩৩৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।এবারের ফলাফলে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে। বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ছেলেদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে মেয়েদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ছেলেদের পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসার বিষয়টি আলাদাভাবে নজরে এসেছে। তবে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের ফলাফলের এই ব্যবধানের পেছনে কী কী কারণ রয়েছে, তা জানতে বিষয়ভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন। জেলাভিত্তিক ফলাফলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। আরও পড়ুন,খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন ও উচ্ছেদ বন্ধের দাবি: সাতক্ষীরায় জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের ১১ দফা ঘোষণাবিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের ফলাফল তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, খাগড়াছড়িতে পাসের হার মাত্র ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। রাঙামাটিতে এ হার ৩৩ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৪১ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ খাগড়াছড়িতে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭০ জনের বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ। ফলে মহানগরী ও খাগড়াছড়ির পাসের হারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ পয়েন্টে। একই শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিয়েও অঞ্চলভেদে এমন বড় ব্যবধান শিক্ষার সুযোগ, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির বৈষম্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। জেলাভিত্তিক ফলাফলের পাশাপাশি কলেজভিত্তিক ফলাফলও বেশ উদ্বেগজনক। এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন তিনটি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিপরীতে ছয়টি কলেজের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছে। একই বোর্ডের অধীনে কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস এবং কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীরও উত্তীর্ণ হতে না পারার ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলের বড় ধরনের বৈপরীত্য তুলে ধরেছে। এমন পরিস্থিতিতে পিছিয়ে থাকা কলেজগুলোর পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষকসংকট, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং বিষয়ভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আরও বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। গত ১৫ বছরের সর্বনিম্ন পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫২ শতাংশ কমে যাওয়া এবং জেলা ও কলেজভিত্তিক ফলাফলের ব্যাপক ব্যবধান সবকিছুই বোর্ডের সামগ্রিক শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলোর পিছিয়ে পড়ার কারণ চিহ্নিত করা, দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি আরও কার্যকর করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পতনের কারণ অনুসন্ধানও জরুরি। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও নিয়মিত ফলাফল পর্যালোচনার মাধ্যমে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক সাফল্য বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত