প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
রিপন রুদ্র ||
দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব পুলিশের। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ, অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এসব দায়িত্ব পালনে পুলিশের তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে এমন প্রশ্ন উঠছে যে, অপরাধের তথ্য পাওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পরিবর্তে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে অপরাধ প্রতিরোধে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে জনমনে প্রত্যাশা অনেক। কোথাও মাদক বিক্রি, কোথাও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, কোথাও চাঁদাবাজি, আবার কোথাও আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস ও স্পাকেন্দ্রকে ঘিরে নানা অভিযোগ—এসব বিষয়ে নাগরিকেরা পুলিশের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পর যদি দ্রুত পদক্ষেপের পরিবর্তে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়, তাহলে অভিযোগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একই সঙ্গে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে নিজেদের তৎপরতা অব্যাহত রাখতে পারে—এমন আশঙ্কাও দেখা দেয়। তবে পুলিশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধীরগতি রয়েছে, কিংবা সব অভিযোগের পর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ঘটনাভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, অপরাধের ধরন, অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি, জনবল এবং আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর পদক্ষেপের ধরন নির্ভর করে। তবু জননিরাপত্তার স্বার্থে অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত যাচাই, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধসংক্রান্ত তথ্য দিতে গিয়ে কোনো নাগরিক বা সাংবাদিক যদি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে শুধু ‘সিনিয়রদের জানান’ এমন পরামর্শ পান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, মাঠপর্যায়ের পুলিশের দায়িত্ব কোথায়? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেন অপরাধ প্রতিরোধের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। একজন নাগরিক কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি, কিংবা অনৈতিক কারবার উপস্থিতি সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দিলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত তথ্যটি গ্রহণ করা, আরও পড়ুন,আবেরা’ স্পা ঘিরে অভিযোগ, পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্নপ্রয়োজনীয় বিবরণ সংগ্রহ করা এবং ঝুঁকি বিবেচনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সার্কেল কর্মকর্তা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, উপকমিশনার কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। তবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিষয়টি যাচাই না করে কেবল অন্য দপ্তরে পাঠিয়ে দিলে কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, একটি কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থায় দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ প্রয়োজন হলে তা দ্রুত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু সাধারণ আইনগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও যদি অপ্রয়োজনীয় অনুমতির অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে অপরাধ প্রতিরোধের গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর কে ব্যবস্থা নেবেন, কত দ্রুত প্রাথমিক যাচাই হবে এবং পরবর্তী অগ্রগতি কী—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। অভিযোগকারীকে বারবার বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর পরিবর্তে একটি কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে নাগরিকদের ভোগান্তি কমবে। মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, প্রতারণা এবং বিভিন্ন অনিয়ম জননিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন তদন্ত এবং অপরাধীদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা প্রয়োজন। মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু খুচরা বিক্রেতা বা মাদক বহনকারীদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধী চক্রের ভূমিকা অনুসন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রেও কেবল গ্রেপ্তারনির্ভর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারামারি, ছিনতাই কিংবা অন্যান্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থের উৎস এবং সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে হবে। স্কুল-কলেজ, পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিও চালাতে হবে। চাঁদাবাজির অভিযোগের ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে চান না। তাই অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস, ভাড়া করা ফ্ল্যাট ও স্পাকেন্দ্রকে ঘিরে মাঝেমধ্যে নানা ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। কোথাও অননুমোদিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, কোথাও লাইসেন্সসংক্রান্ত অনিয়ম, আবার কোথাও মাদক, মানব পাচার, আরও পড়ুন,শারদীয় দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসবপ্রতারণা কিংবা যৌন শোষণের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। তবে অভিযোগ গুরুতর হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রথমে তার বৈধ কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, ভবন ব্যবহারের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণের বিষয় যাচাই করা যেতে পারে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী পুলিশ, স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে মানব পাচার, জোরপূর্বক যৌন শোষণ, মাদক সরবরাহ কিংবা কোনো ব্যক্তিকে আটকে রাখার মতো অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা জরুরি। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধভাবে পরিচালিত হোটেল বা স্পাকেন্দ্রের কর্মীদের অযথা হয়রানি না করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর? একটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একাধিক দপ্তরের কাছে অভিযোগ থাকলে কে তদন্তের নেতৃত্ব দেবে, কে নথিপত্র যাচাই করবে এবং কে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেবে তা নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। সমন্বয়ের অভাবে কোনো অভিযোগ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে জনমনে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। অপরাধ দমনে পুলিশের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো আইন প্রয়োগের সময় সংঘবদ্ধ জনতার বাধা বা মব সৃষ্টি। কোনো অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সময় উত্তেজিত জনতা পুলিশের কাজে বাধা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে। কোথাও পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা কিংবা আটক ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে জনতার প্রতিটি সমাবেশকে মব হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা পুলিশের প্রতিটি বলপ্রয়োগকে যথার্থ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোনো ঘটনার প্রকৃতি, পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিওচিত্র এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং সহিংসভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আইন প্রয়োগের সময় পুলিশকে পেশাদারত্ব, সংযম এবং আনুপাতিক বলপ্রয়োগের নীতি অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের বৈধ দায়িত্ব পালনে বাধা, হামলা কিংবা অপরাধীকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার; জনতার শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই। পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সংঘবদ্ধ সহিংসতা মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল, কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা এবং ঘটনার ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা অসদাচরণের অভিযোগ উঠলেও তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। এতে পুলিশের প্রতি আস্থা এবং আইন প্রয়োগের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। অপরাধের ঘটনা ঘটার পর থানার পুলিশ যদি প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ ব্যাহত হতে পারে। তবে সব সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে নেওয়া সম্ভব নয়; কিছু ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন কিংবা বিশেষায়িত সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। তাই কোন ধরনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে এবং কোন ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনুমোদন লাগবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। থানায় অভিযোগ গ্রহণ, সাধারণ ডায়েরি, মামলা, জরুরি সাড়া এবং তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশ পাঠানো, ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি থানার কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করে অযৌক্তিক বিলম্বের কারণ শনাক্ত করা জরুরি। কোনো অভিযোগের পর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তার কারণ নথিভুক্ত করতে হবে। অভিযোগটি ভিত্তিহীন, এখতিয়ারবহির্ভূত কিংবা অতিরিক্ত তদন্তের প্রয়োজন আছে কি না, আরও পড়ুন,জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হোক জাতীয় অগ্রাধিকার, সম্মিলিত দায়িত্ব হোক বাস্তবায়নের শক্তিতা স্পষ্টভাবে জানানো হলে অভিযোগকারীও বিষয়টি বুঝতে পারবেন। এতে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কমবে এবং পুলিশি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়বে। অপরাধ দমনে কার্যকর ফল পেতে সরকারের নীতিগত নির্দেশনা এবং পুলিশ সদর দপ্তরের প্রশাসনিক তদারকি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু কঠোর নির্দেশ জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য জনবল, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত যাচাই ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সময়ভিত্তিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা যেতে পারে। জরুরি অভিযোগের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সাড়া এবং অন্যান্য অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাথমিক যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, থানা ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কার্যক্রম মূল্যায়নে শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযানের সংখ্যা নয়, অপরাধ প্রতিরোধ, অভিযোগ নিষ্পত্তি, তদন্তের মান এবং নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তৃতীয়ত, মাদক, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, পুলিশের ওপর হামলা কিংবা আইন প্রয়োগে বাধার ঘটনা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ—উভয় ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, হোটেল, গেস্ট হাউস, স্পাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স যাচাই এবং আইনভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ষষ্ঠত, পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা বা অযৌক্তিক বিলম্বের অভিযোগ জানানোর জন্য সহজলভ্য অভিযোগব্যবস্থা রাখতে হবে। অভিযোগের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা পর্যালোচনার সুযোগ থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।পুলিশের কার্যকারিতা শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। একজন নাগরিক বিপদের সময় কত দ্রুত সহায়তা পাচ্ছেন, অভিযোগ জানানোর পর কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং অপরাধের বিরুদ্ধে আইন কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমে গেলে অপরাধের তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত যাচাই ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে নাগরিকেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতায় উৎসাহিত হন। এ কারণে পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক উন্নয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মতবিনিময় এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি জানানো প্রয়োজন। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও অপরাধসংক্রান্ত তথ্যের নিরপেক্ষ যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের অগ্রগতি অনুসরণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগাম অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত না করে প্রমাণ, নথিপত্র ও আইনগত অবস্থান বিবেচনায় প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। এতে জনস্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাও বজায় থাকবে। মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম প্রতিরোধে পুলিশের সক্রিয়তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জবাবদিহির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের সময় পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মব সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর শুধু ‘সিনিয়রদের জানান’ বলে দায়িত্ব শেষ করা কোনো কার্যকর সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজন তথ্য গ্রহণ, দ্রুত যাচাই, যথাযথ পদক্ষেপ এবং ফলাফল পর্যবেক্ষণের সমন্বিত ব্যবস্থা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ের পুলিশের কার্যকর উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও পুলিশ সদর দপ্তরের উচিত অপরাধ দমনে বাস্তবভিত্তিক নির্দেশনা, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তবে কঠোরতা মানে নির্বিচার বলপ্রয়োগ নয়। আইনের সীমার মধ্যে দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণই হওয়া উচিত পুলিশের মূলনীতি। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা, নিরপরাধ নাগরিককে হয়রানি থেকে রক্ষা করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই পুলিশের কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে। আইন প্রয়োগে অযথা বিলম্ব ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দূর করে পেশাদার, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।আরও পড়ুন,বনানীর গেস্ট হাউসের অন্ধকার জগৎ নিয়ে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধএবিষয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেণ, অপরাধ দমনে পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে দায়িত্বশীল, পেশাদার ও তৎপর ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো অপরাধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর তা অবহেলা করা কিংবা অযথা সময়ক্ষেপণ করা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করতে হবে, তবে এর কারণে আইনগত দায়িত্ব পালনে বিলম্ব করা যাবে না। অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত কাজ করে। এসব অপরাধ নির্মূলে জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ অপরাধসংক্রান্ত তথ্য দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা এবং তথ্যদাতার নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, পুলিশের আইনানুগ দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, হামলা করা কিংবা সংঘবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। একই সঙ্গে পুলিশকেও দায়িত্ব পালনের সময় আইন, মানবাধিকার ও পেশাগত আচরণবিধি অনুসরণ করতে হবে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা বা অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা। জনসাধারণের বক্তব্য অনুযায়ী তারা বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ চাই, পুলিশ যেন অপরাধের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, চাঁদাবাজি কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ জানালে পুলিশ যদি শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে বলে, তাহলে সাধারণ মানুষ হতাশ হন। অপরাধীরা সুযোগ পেলে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, আর এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। আমরা চাই, থানায় অভিযোগ জানালে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তা যাচাই করবে এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে পুলিশের দায়িত্ব পালনের সময় কেউ যেন সংঘবদ্ধভাবে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি জনগণকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের দাবি, সরকার ও পুলিশ প্রশাসন অপরাধ দমনে কার্যকর নির্দেশনা দিক এবং মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুক। পুলিশের কোনো সদস্য দায়িত্বে অবহেলা করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার পুলিশ আইনানুগ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়লে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাও দিতে হবে। আমরা এমন একটি নিরাপদ সমাজ চাই, যেখানে অপরাধী যে-ই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না এবং সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে বসবাস করতে পারবেন।