প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
জুবাইর আহমেদ খান রোহান ||
লালমনিরহাট শহরে গণশৌচাগারের সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা মানুষ। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রয়োজনের সময় শৌচাগার খুঁজে পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত ১৪টি গণশৌচাগারের অধিকাংশই তালাবদ্ধ, পরিত্যক্ত অথবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান শৌচাগার সংস্কার, নতুন স্থাপনা নির্মাণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, ঈদগাহ মাঠ ও সরকারি স্থাপনার ভেতরে কয়েকটি শৌচাগার থাকলেও সেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়। রাস্তার পাশে থাকা কয়েকটি শৌচাগারও তালাবদ্ধ। সচল কিছু শৌচাগারে রয়েছে অপরিচ্ছন্নতা, দুর্গন্ধ, ভাঙা দরজা ও ছিটকিনি এবং ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার সমস্যা। অনেক শৌচাগারে নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও নেই। ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ৯ ওয়ার্ডের লালমনিরহাট পৌরসভার আয়তন ১৭ দশমিক ৯৫ বর্গকিলোমিটার। ২০০৫ সালে পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, পৌরসভার জনসংখ্যা ৬৭ হাজার ৩৫৫ জন। একই জনশুমারি অনুযায়ী, সদর উপজেলার জনসংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪৬৩ জন। এর মধ্যে ৯১ হাজার ৩৭১ জন বা ২৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ নগর এলাকায় বসবাস করেন। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পৌরসভা ও সদর এলাকার প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭২৬ মানুষ শহরকেন্দ্রিক নাগরিক সেবা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া জেলার পাঁচ উপজেলার মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আদালত ও সরকারি -বেসরকারি বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন জেলা শহরে আসেন। জেলার মোট জনসংখ্যা ১৪ লাখ ২৮ হাজার ৪০৬ জন। ফলে শহরের বিদ্যমান নাগরিক সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। সদর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) ও পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, আরও পড়ুন,লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান পালিতশহরে নির্মিত ১৪টি গণশৌচাগারের মধ্যে ডিপিএইচইর ৯টি এবং পৌরসভার ৫টি। ডিপিএইচইর নির্মিত ৯টি গণশৌচাগারের মধ্যে ৪টি নির্দিষ্ট স্থাপনার ভেতরে, ২টি তালাবদ্ধ এবং ৩টি পরিত্যক্ত। এসব শৌচাগারের কোনো পরিচালনাকারী নেই। এগুলো বিডিআর হাট, কালেক্টরেট মাঠ, স্মৃতিসৌধের পাশে, মার্কস মসজিদের ভেতরে, শহীদ শাহজান কলোনি, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে মুক্তমঞ্চের পাশে, চার্চ অব গড গির্জার পাশে ও নয়ারহাট বাজারে অবস্থিত। অন্যদিকে, পৌরসভার নির্মিত ৫টি গণশৌচাগারের মধ্যে ২টি তালাবদ্ধ, ১টি উন্মুক্ত এবং ২টি পরিত্যক্ত। এগুলো বাস টার্মিনাল, রাফি ক্লিনিকের বিপরীতে, নয়ারহাট, সেনা মৈত্রী হকার্স মার্কেটের উত্তর পাশে এবং বিডিআর রেলগেটের বাবু মার্কেটের বিপরীতে অবস্থিত। পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে গণশৌচাগার না থাকায় পুরুষদের অনেক সময় রাস্তার পাশে প্রস্রাব করতে বাধ্য হতে হয়। আবার অনেকে দীর্ঘ সময় প্রস্রাব-পায়খানা আটকে রাখেন। পাটগ্রাম থেকে মামলার কাজে জেলা জজ আদালতে আসা হাফিজুর রহমান বলেন, শহরের দৃশ্যমান স্থানে গণশৌচাগার না থাকায় প্রয়োজনের সময় কোথায় যাবেন, তা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। বাসস্ট্যান্ডে আসা বেলি বেগম ও তাঁর মেয়ে তাবাসসুম জান্নাত বলেন, বাসস্ট্যান্ডে একটি শৌচাগার থাকলেও সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত একজনের বাসায় গিয়ে শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়েছে। বাটা মোড়ে কেনাকাটা করতে আসা এক নারী বলেন, ছোট শিশুকে নিয়ে শহরে এসে শৌচাগারের অভাবে চরম সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য দৃশ্যমান, নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য গণশৌচাগার থাকা জরুরি। শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম সাদেকী বলেন, বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারযোগ্য গণশৌচাগারের সংকট রয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনসমাগমস্থলে দৃশ্যমান স্থানে পর্যাপ্ত গণশৌচাগার নির্মাণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস এর সংবাদদাতা মোঃ বিপুল ইসলাম বলেন, শহরে প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন গণশৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান শৌচাগারগুলো সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিচালনাকারী নিয়োগ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। লালমনিরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আবু- আল-হাজ্জাজ বাসসকে বলেন, পর্যাপ্ত গণশৌচাগার না থাকায় সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পুরোনো শৌচাগার সংস্কারের পাশাপাশি নতুন শৌচাগার নির্মাণ করা উচিত।আরও পড়ুন,পুলিশের মানসিক সুরক্ষায় সিএমপির বিশেষ নজর তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় প্রস্রাব বা পায়খানা আটকে রাখলে মূত্রনালির সংক্রমণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান স্থানে পর্যাপ্ত গণশৌচাগার নির্মাণ জরুরি। লালমনিরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা ও শহর পরিকল্পনাবিদ এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান তালুকদার বলেন, এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজেট দিলেই কাজ শুরু করা হবে।লালমনিরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. বাদশাহ্ আলমগীর বলেন, তাঁরা শৌচাগার নির্মাণ করে স্থানীয়দের দায়িত্বে দিয়ে দেন। হয়তো এ কারণেই সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। বর্তমানে নতুন শৌচাগার নির্মাণের কোনো প্রকল্প নেই। নতুন করে প্রস্তাব দিতে হবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লালমনিরহাট পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা হরানন্দ রায় বলেন, পৌর এলাকার গণশৌচাগার সংকট সমাধানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা প্রস্তাব দিতে বলেছেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে দ্রুত স্থান নির্ধারণ করে কিছুদিনের মধ্যেই বাস্তবায়নকাজ শুরু করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গণশৌচাগার সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল ও জনসমাগমস্থলে নতুন শৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান স্থাপনাগুলো সংস্কার করে সচল রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এ সংকট নিরসন সম্ভব, যা জনদুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি শহরের পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।