প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
লামায় ৫ ম্রোপাড়ায় তীব্র শিক্ষার সংকট
মো ইনতাজ হোসেন ||
পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াতে সরকারের নানা ধরনের উন্নয়নমুখী উদ্যোগ থাকলেও বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দুর্গম সাঙ্গু মৌজায় চিত্র একদমই ভিন্ন। মৌজাটিতে কেবল একটিমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে; যা প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত 'রামথুইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'। দূরত্ব ও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মৌজা সীমানার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সর্ববৃহৎ ম্রোপাড়া রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ ম্রো সম্প্রদায়ের অন্তত পাঁচটি পাড়ার শতাধিক শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে। মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে এলাকাটিতে অবিলম্বে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের আকুল আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয় ম্রো বাসিন্দারা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের সাঙ্গু মৌজার রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বহু বছর ধরে ম্রো জনগোষ্ঠীর বহু পরিবার বসবাস করে আসছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ ও নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানকার শিশুরা চাইলেও স্কুলে যেতে পারছে না। নিকটস্থ সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আলীকদম উপজেলার ‘মংহ্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ রয়েছে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে এবং পশ্চিম-উত্তরে ‘ত্রিশডেবা রামথুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ রয়েছে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ি ছড়া, নদী ও উঁচু-নিচু পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে এত দূর হেঁটে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের পক্ষে ক্লাস করা একেবারেই অসম্ভব। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ধস ও ছড়ার তীব্র স্রোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আরও পড়ুন,কসবায় ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, হুমকির ভয়ে ৩ দিন পর মামলাকাছাকাছি কোনো বিদ্যালয় না থাকায় এই পাঁচটি পাড়ার শতাধিক শিশুর শৈশব কাটছে কোনো বর্ণমালার জ্ঞান ছাড়াই। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অক্ষরজ্ঞানহীন এসব শিশু বাবা-মায়ের সাথে জুমচাষ ও পাহাড়ের দৈনন্দিন জীবিকার কাজে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে তারা দেশের শিক্ষার মূল স্রোতধারা থেকে চিরতরে পিছিয়ে পড়ছে। সম্প্রতি রোয়াজাপাড়ায় ব্যক্তি উদ্যোগে ‘সিংমং’ নামে এক ব্যক্তি একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে ২ জন শিক্ষক দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করানো হচ্ছে। এছাড়া ২০১৮ সালে আলীকদম জোনের সহায়তায় ‘গয়ালমারা’ নামক গ্রামে 'মৈত্রী স্কুল' প্রতিষ্ঠিত হলেও রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ আশেপাশের ৫টি ম্রোপাড়ার শিশুদের জন্য কোনো স্থায়ী সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ক্ষোভ ও বিষাদ প্রকাশ করে স্থানীয় অভিভাবকরা বলেন, "অন্যান্য অঞ্চলের শিশুরা স্কুলে যায়, বই পড়ে, কিন্তু আমাদের সন্তানরা বর্ণমালাই চিনতে পারছে না। আমাদের পাড়ায় অন্তত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হোক, যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।" লামা উপজেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষার সুযোগ না থাকায় সাঙ্গু মৌজার ম্রো জনগোষ্ঠী সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্গম এলাকায় শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আরও পড়ুন,চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের জিম্মিতে ইপিজেডের ব্যবসায়ীরাতবে সাঙ্গু মৌজার ভৌগোলিক বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনা করে সেখানে দ্রুত একটি নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন অথবা বিকল্প শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা অত্যন্ত জরুরি।প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-৩ শাখা হতে জানা গেছে, সম্প্রতি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য চাহিদাভিত্তিক নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে মতামত চাওয়া হয়েছিল। এর ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফাঁসিয়াখালী ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের রোয়াজাপাড়াটি রেংলে পাড়া, মেনক্রুং পাড়া, রেংছম পাড়া এবং মাংখাইক পাড়ার কেন্দ্রে অবস্থিত। স্থানটিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয় জমি সংস্থানও রয়েছে। এ বিষয়ে সাঙ্গু মৌজা হেডম্যান চংপাত ম্রো বলেন, "আমি প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কাছে সাঙ্গু মৌজার রোয়াজাপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সুপারিশ ও প্রত্যয়ন প্রদান করেছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর অগ্রগতি লক্ষ্য করিনি।" শিক্ষাই প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। সাঙ্গু মৌজার ৫টি ম্রোপাড়ার কোমলমতি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে এবং তাদের দেশের মূলধারার উন্নয়নের সাথে যুক্ত করতে অবিলম্বে একটি বিদ্যালয় স্থাপনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের শুভ দৃষ্টি ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত