প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
ছেলে ইটভাটায় কাজে না যাওয়ায় মাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, শ্যামনগরে চাঞ্চল্য
শেখ আমিনুর হোসেন ||
ছেলেকে ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে নেওয়ার জন্য অগ্রিম টাকা দেওয়ার দাবি করে ছেলে কাজে না যাওয়ায় তাঁর ৫২ বছর বয়সী মাকে জোরপূর্বক মোটরসাইকেলে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ভাটা সরদারের বিরুদ্ধে। পরে তাঁকে একটি শ্রমিকবাহী বাসে তুলে বরিশালের একটি ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর স্বজনেরা। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ জানাতে থানায় যাওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। ঘটনাটি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালি গ্রামের। ভুক্তভোগী দীপালী মণ্ডল (৫২) ওই গ্রামের পঞ্চানন মণ্ডলের স্ত্রী। অভিযুক্ত আমজাদ হোসেন একই উপজেলার শ্রীফলকাটি গ্রামের জিয়াদ আলীর ছেলে এবং ইটভাটার শ্রমিক সরদার। ভুক্তভোগীর মেয়ে একাদশী মণ্ডলের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ভাই জগদীশ মণ্ডল ইটভাটার শ্রমিক। বরিশালের একটি ইটভাটায় কাজের জন্য জগদীশকে টাকা দেওয়া হয়েছে দাবি করে গত বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে আমজাদ তাঁদের বাড়িতে যান। এ সময় তিনি জগদীশের অবস্থান জানতে চান। জগদীশ দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে দেবহাটার টাউনশ্রীপুরে গেছেন বলে তাঁকে জানানো হয়। একাদশীর অভিযোগ, পরদিন বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দীপালীকে মুঠোফোনে ডেকে জেলেখালি এলাকার লুৎফরের দোকানের সামনে যেতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর জগদীশের সঙ্গে কথা বলার কথা বলে দীপালীকে জোরপূর্বক মোটরসাইকেলে তোলা হয়। পরে তাঁকে হরিনগরের পুরোনো বাড়ির কথা বলে শ্রীফলকাটি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশের একটি স্থানে নেওয়া হয়।আরও পড়ুন,হোটেলের চাকরির আড়ালে পতেঙ্গায় নারী সরবরাহের অন্ধকার সাম্রাজ্যএকপর্যায়ে দীপালী প্রতিবাদ করলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁকে শ্রমিকবোঝাই একটি বাসে উঠতে বাধ্য করা হয়। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনেরা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলেও বাসের নম্বর জানাতে না পারায় তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি বলে জানান একাদশী। একাদশী মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে জানান, ঘটনার পর তিনি তাঁর মামাতো ভাই পরেশ, ইউপি সদস্য দেবব্রত, বিএনপি নেতা একরামুল হকসহ কয়েকজনকে নিয়ে শ্যামনগর থানায় যান। তাঁর অভিযোগ, সেখানে তাঁদের বক্তব্য শোনার পরিবর্তে জগদীশ কেন ইটভাটায় কাজে যাওয়ার কথা দিয়েও যাননি, সে বিষয়ে কৈফিয়ত চাওয়া হয়। পরদিন সকালে থানায় যেতে বলা হয়। এ সময় দীপালী ও জগদীশ ইটভাটায় কাজের জন্য টাকা নিয়েছেন—এমন দাবি সমর্থনে একটি কল রেকর্ডিং শোনানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে ওই রেকর্ডিংয়ের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একাদশীর ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে থানার পক্ষ থেকে তাঁর মামাতো ভাই পরেশকে ফোন করে যেতে বলা হয়। শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোর সাড়ে তিনটার দিকে তাঁরা থানায় গিয়ে দীপালীকে দেখতে পান। সেখানে উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন ও আমজাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি। একাদশীর দাবি, এ সময় এসআই আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিয়ে বেশিদূর না এগোনোর পরামর্শ দেন এবং ঘটনার জন্য ক্ষমা চান। তবে এ বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। শনিবার (২৪ অক্টোবর ) বিকেলে নিজ বাড়িতে ফিরে দীপালী মণ্ডল অভিযোগ করেন, তাঁকে এক কাপড়ে বরিশালের হিজলখালির কামালপুর এলাকার একটি ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে কাজ করার জন্য আমজাদ তাঁকে শাড়ি, সায়া ও ব্লাউজ কিনে দেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে সেগুলো ব্যবহার করেননি বলে জানান দীপালী। ক্ষোভ প্রকাশ করে দীপালী সংবাদ দিগন্তকে বলেন, তাঁর ছেলে কোনো অপরাধ করে থাকলে তার দায় তিনি কেন নেবেন? ছেলের পরিবর্তে তাঁকে কেন তুলে নিয়ে যাওয়া হবে? তিনি হিন্দু বলেই এমন আচরণের সাহস পেয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন ভুক্তভোগী নারী। দীপালী আরও অভিযোগ করেন, অসুস্থতার কারণে থানা থেকে মেয়ের বাড়িতে চলে যাওয়ার পর শনিবার আমজাদ তাঁকে ফোন করে মুনসুর সরদারের গ্যারেজ মোড়ে যেতে বলেন। অন্য ভাটা সরদারের কাছে না গেলে পরিণতি ভালো হবে না বলেও তাঁকে শাসানো হয় বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে, জগদীশের পাসপোর্ট বই আমজাদ আগে থেকেই নিজের জিম্মায় রেখেছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাদশী মণ্ডল। জেলেখালি গ্রামের হাবিবুর রহমান, এনামুল হক, গিরেন মণ্ডল ও উদয় মণ্ডলসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দারা সংবাদ দিগন্তকে বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। ছেলের সঙ্গে আর্থিক বিরোধের কারণে তাঁর মাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ গুরুতর। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন। অভিযুক্ত আমজাদ হোসেন দাবি করেন, তিনি দীপালী মণ্ডলকে জোর করে নিয়ে যাননি। তবে জগদীশের পাসপোর্ট বই তাঁর জিম্মায় রয়েছে বলে স্বীকার করেন। জগদীশকে টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁর মা জানেন বলেও দাবি করেন আমজাদ। পুলিশের কথামতো দীপালীকে থানায় নিয়ে এসেছিলেন বলে জানান তিনি। শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন সংবাদ দিগন্তকে বলেন, মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশের সহায়তায় দীপালী মণ্ডলকে ফিরিয়ে এনে তাঁর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারীর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মামলা হয়েছে কি না, অভিযোগের ভিত্তিতে কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং জগদীশের সঙ্গে কথিত আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত অবস্থা কী এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত