প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
রিপন রুদ্র: ||
বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে
গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা শারদীয় দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের
সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি, ঢাকের বাদ্য,
শঙ্খধ্বনি, আলোকসজ্জায় সজ্জিত পূজামণ্ডপ এবং ভক্তদের প্রার্থনায়
প্রতিবছর দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে আনন্দ, আবেগ ও মিলনের এক অনন্য
উপলক্ষ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এ উৎসব মানুষের মধ্যে
সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত
করার বার্তা দেয়।
শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মন্দির ও
পূজামণ্ডপগুলোতে আয়োজন করা হয় নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠানের। প্রতিমা দর্শন, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি, আরতি এবং
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে উৎসবের পরিবেশ। পরিবারের
সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে পূজামণ্ডপে ঘুরতে বের হন নানা
বয়সী মানুষ। উৎসবকে ঘিরে স্থানীয় বাজার, পোশাকের দোকান,
খাবারের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য। হিন্দু
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার
প্রতীক। পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার
বিজয় অশুভ শক্তির পরাজয় এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে
বিবেচিত হয়। এ বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা মানুষকে অন্যায়,
অনাচার, হিংসা ও অসত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয়।
দুর্গোৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি রয়েছে মানবিক ও
সামাজিক শিক্ষা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দুর্বল ও অসহায়
মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সমাজে
শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় এ উৎসবের অন্যতম বার্তা। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী
দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন থেকে অশুভ ও অকল্যাণ দূর হয়ে
সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হবে।
দুর্গাপূজার বিভিন্ন দিন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বিশেষ তাৎপর্য
বহন করে। ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন ও পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।আরও পড়ুন, শীতের আগমনী বার্তা, প্রস্তুত হচ্ছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় সপ্তমীতে পূজা-অর্চনা, অষ্টমীতে মহাষ্টমীর বিশেষ পূজা ও অঞ্জলি এবং
নবমীতে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। এরপর বিজয়া দশমীতে
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি
ঘটে। তিথি ও স্থানীয় রীতিভেদে বিভিন্ন আয়োজনের সময়সূচিতে
পার্থক্য থাকতে পারে। পূজার দিনগুলোতে ভক্তরা নতুন পোশাক পরে মন্দিরে
যান এবং দেবীর চরণে ফুল, বেলপাতা ও অন্যান্য উপকরণ নিবেদন করেন।
অনেক মণ্ডপে আয়োজন করা হয় ধর্মীয় আলোচনা, প্রসাদ বিতরণ,
স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এসব আয়োজন
উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বিজয়া দশমী দুর্গোৎসবের একটি আবেগঘন অধ্যায়। প্রতিমা
বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানোর সময় ভক্তদের মধ্যে
আনন্দের পাশাপাশি বিষাদের অনুভূতিও কাজ করে। তবে এ বিদায় পরবর্তী
বছরের নতুন প্রত্যাশা ও শুভাগমনের অপেক্ষা তৈরি করে। বাংলাদেশের সমাজ ও
সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।
বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং
সামাজিক বন্ধন এ দেশের বহুত্ববাদী পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। শারদীয়
দুর্গাপূজা সেই সম্প্রীতির চর্চাকে আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ
সৃষ্টি করে। অনেক এলাকায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একে অপরের উৎসবে
অংশ নেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে
নেন। পূজামণ্ডপের আয়োজন, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম ও সামাজিক
উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা উৎসবের পরিবেশকে আরও
সৌহার্দ্যপূর্ণ করে তোলে।
ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও মানুষের মৌলিক চাহিদা, সুখ-দুঃখ ও
মানবিক অনুভূতি অভিন্ন। এ উপলব্ধি থেকে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও
সহনশীলতার চর্চা বাড়ানো জরুরি।আরও পড়ুন, মব আতঙ্ক ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভেদ বা
বিদ্বেষ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে
একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত উৎসবের অন্যতম
শিক্ষা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শুধু উৎসবের সময় নয়,
সারা বছরই দায়িত্বশীল আচরণ, সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের
প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ধর্মীয়
পরিচয়ের কারণে বৈষম্য, হয়রানি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন, সে
বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বড় ধর্মীয় উৎসবে বিপুলসংখ্যক
মানুষের সমাগম ঘটে। ফলে পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা,
যান চলাচল, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি
চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উৎসব নির্বিঘ্ন
রাখতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয়
জনপ্রতিনিধি, পূজা উদ্ধসঢ়;যাপন কমিটি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের
সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
প্রতিটি পূজামণ্ডপে পর্যাপ্ত প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ রাখা, বৈদ্যুতিক
সংযোগ নিরাপদ রাখা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং
জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের নিরাপদে
চলাচলের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। গুজব, অপতথ্য
কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো উসকানিমূলক বক্তব্য
উৎসবের পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে পারে। তাই যাচাই না করা তথ্য
প্রচার থেকে বিরত থাকা এবং কোনো সন্দেহজনক ঘটনা দেখা গেলে
নিজেরা আইন হাতে না নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা
প্রয়োজন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের একক দায়িত্ব নয়; পূজামণ্ডপের
আয়োজক, দর্শনার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং গণমাধ্যমসহ সবার
সচেতন অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দায়িত্বশীল আচরণ ও পারস্পরিক
সহযোগিতার মধ্য দিয়েই উৎসবকে আনন্দময় ও নিরাপদ রাখা সম্ভব।আরও পড়ুন, যাত্রাবাড়ীর-সায়েদাবাদ এলাকায় একাধিক আবাসিক হোটেল ঘিরে অভিযোগ দুর্গাপূজাকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক কর্মচাঞ্চল্য
তৈরি হয়। প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, বাঁশ ও কাঠের কারিগর,
আলোকসজ্জাকর্মী, পোশাক ব্যবসায়ী, ফুল বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক
এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এ উৎসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন।
পূজামণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা তৈরি, সাজসজ্জা, পোশাক কেনাকাটা ও
অতিথি আপ্যায়নের কারণে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ে। এতে মৌসুমি
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো
উপকৃত হয়। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমাশিল্পের সঙ্গে যুক্ত
কারিগরদের সৃজনশীলতা ও শ্রম দুর্গোৎসবের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক আয়োজন বাঙালির লোকজ
ঐতিহ্য, সংগীত, নৃত্য, নাটক ও শিল্পচর্চাকে উৎসাহিত করে। নতুন
প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও উৎসবটির ভূমিকা
রয়েছে। তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি অপচয় রোধ, পরিবেশ সুরক্ষা
এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রতি সম্মান
দেখানো জরুরি। উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা
বাহ্যিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের প্রতি মানুষের
ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটে।
সমাজের অসচ্ছল মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি, প্রবীণ ও সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে
দাঁড়ানোর মাধ্যমে দুর্গোৎসবের মানবিক তাৎপর্য আরও গভীর হতে
পারে।
উৎসব উপলক্ষে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্য, পোশাক ও
প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করতে পারেন। একই সঙ্গে রক্তদান,
পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মতো
উদ্যোগও সামাজিক কল্যাণে অবদান রাখতে পারে।
ধর্মীয় উৎসব মানুষকে আনন্দ দেয়, কিন্তু সেই আনন্দ যেন অন্যের
অসুবিধার কারণ না হয়, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। আরও পড়ুন, উৎসব মূখর পরিবেশে গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের কার্যালয় উদ্বোধনউচ্চ শব্দে মাইক
ব্যবহার, যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা, যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কিংবা
পরিবেশদূষণ থেকে বিরত থাকা সবার দায়িত্ব। উৎসবের সৌন্দর্য তখনই
পূর্ণতা পাবে, যখন আনন্দের পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও স্বাচ্ছন্দ্যের
প্রতিও সম্মান দেখানো হবে। বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা
ও আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই প্রত্যেক
নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ
এবং নিরাপদে জীবনযাপনের অধিকার সম্মান করা প্রয়োজন। ধর্মীয়
সম্প্রীতি রক্ষা করা রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
শারদীয় দুর্গাপূজা সেই দায়িত্বের কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা
ও সহযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকলে সমাজ আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ
হতে পারে। কোনো ধরনের বৈষম্য, বিদ্বেষ বা সহিংসতা যেন মানুষের
উৎসবের আনন্দকে ম্লান করতে না পারে, সে বিষয়ে সবার সতর্ক থাকা
জরুরি।
শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালির ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্প-সংস্কৃতি
ও মানবিক মূল্যবোধের এক সম্মিলিত প্রকাশ। দেবী দুর্গার আরাধনার
মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা করা হয়,
তা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন ন্যায়, সততা,
সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে। উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক
প্রতিটি মানুষের জীবনে। ধর্মীয় পরিচয় যেন কখনো মানুষের মধ্যে
বিভেদের কারণ না হয়; বরং পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ়
করুক। শারদীয় দুর্গোৎসবের শিক্ষা হোক অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ
হওয়া, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায়
এগিয়ে আসা।