প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬
মাটির প্রতিমায় ফুটছে দেবীর রূপ, শ্যামনগরের ৭১ মণ্ডপে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি
শেখ আমিনুর হোসেন ||
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজ। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, মহিষাসুর এবং তাঁদের বাহনের প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। এ বছর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে মোট ৭১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৭০টি।আসন্ন দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ইতোমধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ করা, মণ্ডপ সাজানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রস্তুতি চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ প্রতিমা। মাটির কাঠামো তৈরি, খড় ও মাটির প্রলেপ দেওয়া, শুকানো এবং সূক্ষ্ম কারুকাজের মাধ্যমে দেবী দুর্গাসহ অন্য দেবদেবীর প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে নিরলস কাজ করছেন শিল্পীরা। এরপর রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হবে দেবীর মুখাবয়ব ও অলংকারের নান্দনিকতা।মৃৎশিল্পী বাপ্পা বিশ্বাস ও বাবু পাল সংবাদ দিগন্তকে জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও তাঁরা বেশ কয়েকটি প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছেন। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাজের ব্যয়ও বেড়েছে। এরপরও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা।আরেক মৃৎশিল্পী মনোরঞ্জন পাল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ অত্যন্ত ধৈর্য ও নিপুণতার। আরও পড়ুন, পাসপোর্ট সেবায় অনিয়মের অভিযোগ নরসিংদীতে তদন্তের দাবিশিল্পীদের ভাষ্য, প্রতিমা নির্মাণ শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, এটি তাঁদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ। তবে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও নির্মাণ ব্যয়ের চাপ তাঁদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।উপজেলা পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে এবারের পূজামণ্ডপের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১টি। এলাকাভিত্তিক মণ্ডপের সংখ্যা হলো—শ্যামনগর পৌরসভায় ১৫টি, কাশিমাড়িতে ২টি, নূরনগরে ৩টি, কৈখালীতে ৫টি, রমজাননগরে ৬টি, মুন্সীগঞ্জে ১২টি, ঈশ্বরীপুরে ৪টি, বুড়িগোয়ালিনীতে ৯টি, আটুলিয়ায় ১১টি, পদ্মপুকুরে ২টি এবং গাবুরায় ২টি।শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী সংবাদ দিগন্তকে বলেন, উপজেলায় এবার ৭১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি মণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা, মাইকিং এবং নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা রাখা হবে।শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক সংবাদ দিগন্তকে বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। পূজার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করে শুভশক্তির বিজয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাই এই উৎসব অন্যায়, অশুভ ও অহংকারের বিরুদ্ধে ন্যায়, সত্য ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।আরও পড়ুন, কালকিনিতে আড়িয়াল খাঁ নদীতে অভিযান, ১ হাজার ৭০০ মিটার অবৈধ জাল উদ্ধার করে পুড়িয়ে ধ্বংসধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পী, ঢাকি, ফুল ব্যবসায়ী, আলোকসজ্জাকর্মী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মণ্ডপ পরিদর্শন ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে ভূমিকা রাখে।পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার প্রধান আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে। ১৭ অক্টোবর শনিবার মহাসপ্তমী, ১৮ অক্টোবর রবিবার মহাষ্টমী, ১৯ অক্টোবর সোমবার মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী পালিত হবে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের মূল দুর্গোৎসব। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে।মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রতিষ্ঠা, অষ্টমীতে অঞ্জলি ও বিশেষ পূজা এবং নবমীতে হোম ও আরতির আয়োজন করা হয়। বিজয়া দশমীতে দেবীকে বিদায় জানানোর আগে বিভিন্ন মণ্ডপে সিঁদুর খেলা, ধুনুচি নাচ ও বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন থাকে।সব মিলিয়ে শ্যামনগরে এবারের দুর্গাপূজাকে ঘিরে ধর্মীয় প্রস্তুতির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের কর্মচাঞ্চল্যও বেড়েছে। এখন প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ করে মণ্ডপগুলোকে উৎসবের উপযোগী করে তোলাই আয়োজকদের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত