প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
মো. বাবু ||
দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাস ও আনস্টাফিং কার্যক্রমকে ঘিরে সিন্ডিকেট গঠন, ঘুষ বাণিজ্য, নথি আটকে রাখা এবং ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) কর্মচারীদের চরম হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার (এসি) ওমর কাউসার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে এই দুর্নীতি ও অপপ্রচারের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ প্রতিনিধিরা। তাঁদের ভাষ্যমতে, অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ছুতোয় পণ্য ছাড় বন্ধ রাখা হচ্ছে, যার ফলে বন্দরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পাঁচটি আনস্টাফিং গেটে নিয়মিত ‘সাপ্তাহিক বকশিস’ বাণিজ্য
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটিসহ প্রধান পাঁচটি আনস্টাফিং গেট থেকে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকা ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসের কয়েকজন কর্মচারী ও ভুক্তভোগী জানান, প্রতিটি আনস্টাফিং গেট থেকে সাপ্তাহিক চুক্তিতে প্রায় দেড় লাখ টাকা করে তোলার নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।আরও পড়ুন,গাজীপুরে খাদ্য পরিদর্শক সোহেল আহামেদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, সাংবাদিকদের অর্থ দেওয়ার দাবি নির্দিষ্ট এই অর্থ না দিলে পণ্য খালাসের স্বাভাবিক ফাইল অগ্রসর হয় না। যদিও কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে স্বাধীন কোনো তদন্ত বা নথিপত্রের সত্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়নি, তবুও গেটগুলোতে এ ধরনের প্রকাশ্য চাঁদাবাজির বিষয়ে সিএন্ডএফ মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সহকারী কমিশনারের দপ্তরে ঘুরঘুর ও কৃত্রিম জট তৈরির কৌশল
ভুক্তভোগী সিএন্ডএফ কর্মচারীদের অভিযোগ, কাস্টমস কায়িক পরীক্ষা শেষ করে গেটে নিয়ে যাওয়ার পরও বাণিজ্যিক পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার ওমর কাউসারের বিশেষ অনুমতি (অ্যাপ্রুভাল) নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। গেটের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা পণ্য যাচাই-বাছাই করার পর ফাইল ওকে করলেও, এসি ওমর কাউসারের কার্যালয়ে তা পুনর্বার পরীক্ষার কথা বলে আটকে রাখা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, কাস্টমস হাউসে ফাইল নিয়ে গেলে তাঁদের সারাদিন বসিয়ে রাখা হয়। এরপর রাত ১০টা থেকে ১১টার দিকে জানানো হয় যে পণ্য আজ পরীক্ষা করা সম্ভব নয়, পরদিন আসা হোক। দিনের পর দিন এই কৃত্রিম জট তৈরি করার পেছনের মূল উদ্দেশ্য—ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ চার্জ বা পোর্ট ডেমারেজের ভয়ে ফেলে অনৈতিক অর্থের বিনিময়ে দ্রুত নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেওয়া।
রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের ভূমিকা
এই দুর্নীতির চক্রে এমবিবি আনস্টাফিং গেটের দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের নাম জোরালোভাবে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সুমন কান্তি বিশ্বাস নিয়মিত সহকারী কমিশনার ওমর কাউসারের কার্যালয়ে যাতায়াত করেন এবং পণ্যের ছাড়পত্রে কৃত্রিম জটিলতা সৃষ্টি করার প্রাথমিক ছকটি তিনি-ই তৈরি করেন। বিভিন্ন টেকনিক্যাল ত্রুটি কিংবা ভুয়া সন্দেহের অজুহাত তুলে ফাইল কাস্টমস এসি’র রুমে পাঠাতে তিনি বাধ্য করেন। এতে করে সাধারণ সিএন্ডএফ প্রতিনিধিরা দিশেহারা হয়ে পড়েন।
সংবাদ প্রকাশেও থামেনি হয়রানি, উল্টো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ
ভুক্তভোগী কর্মচারীরা আক্ষেপ করে জানান, কাস্টমসের এই অনিয়ম নিয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মৌখিক নজরে আনা বা গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া দূরে থাক, উল্টো হয়রানির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের ফাইলগুলো কাস্টমসে দীর্ঘদিন আটকে রেখে শাস্তিমূলক বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
সিএন্ডএফের এক কর্মচারী বলেন, "সারাদিন অপেক্ষা করার পর রাতে বলা হয় কাল আসেন। এক দিন ফাইল আটকে থাকা মানেই বন্দরে হাজার হাজার টাকার ডেমারেজ বা ওভারস্টেইং মাশুল গোনা। আর্থিক ক্ষতি বাঁচাতেই অনেকে বাধ্য হয়ে তাদের অনৈতিক দাবির কাছে নতি স্বীকার করছেন।"
ব্যবসায়িক পরিবেশ ও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব
জাতীয় রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় এই খাতটিতে যদি প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ীদের এভাবে জিম্মি করা হয়, তবে দেশের সার্বিক ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য খালাসে বিলম্ব ঘটানোর ফলে একদিকে যেমন পণ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে আমদানিকারকরা চরম আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা।
তাঁদের স্পষ্ট দাবি:
সহকারী কমিশনার ওমর কাউসার ও রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে।
আনস্টাফিং গেটগুলোতে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানোসহ পণ্য ছাড়করণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটালাইজড ও স্বচ্ছ করতে হবে।
অনৈতিক উদ্দেশ্যে ফাইল আটকে রাখার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের কাস্টমস থেকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ এসব গুরুতর অভিযোগ সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকিফহাল এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। (তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের লিখিত বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি; তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য প্রদান করা হলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত