প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
সাতক্ষীরার তিনশ বছরের ঐতিহ্য, গুড়পুকুর মেলায় উৎসবের আমেজ
শেখ আমিনুর হোসেন ||
দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে সাতক্ষীরা শহরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা। শহরের শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে শুরু হয়েছে প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো এ মেলা। মনসা ও বিশ্বকর্মা পূজাকে ঘিরে আয়োজিত এই মেলা এখন পরিণত হয়েছে সাতক্ষীরার মানুষের অন্যতম বড় লোকজ ও সামাজিক উৎসবে। দীর্ঘ বিরতির পর মেলা ফিরে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০ দিনব্যাপী এ মেলা গত ১ অক্টোবর শুরু হয়েছে। আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত মেলা চলবে। আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক। উদ্বোধনের পর থেকেই প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণে বাড়ছে দর্শনার্থীদের ভিড়।মেলায় বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট ও স্টল বসেছে। শিশুদের খেলনা, মাটির তৈরি সামগ্রী, গৃহস্থালি পণ্য, পোশাক, প্রসাধনী, হস্তশিল্পসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্যও রয়েছে নানা আয়োজন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।সাতক্ষীরার সিনিয়র সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ বলেন, গুড়পুকুর মেলা কেবল একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এসেছে। তবে মেলার ঐতিহ্য ও লোকজ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এ ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শেখ আলমগীর হোসেন বলেন, গুড়পুকুর মেলা সাতক্ষীরার লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মনসা ও বিশ্বকর্মা পূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মেলার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, কারুশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের সামাজিক যোগাযোগও জড়িয়ে রয়েছে।তিনি বলেন, আধুনিকতার প্রভাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হারিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় গুড়পুকুরের মতো ঐতিহ্যবাহী মেলা টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মকে এই মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এর গুরুত্ব আরও বাড়বে।আরও পড়ুন, সাংবাদিক ও আইনজীবী পরিচয়ে লামায় যাকে তাকে মারধর করার হুমকি অভিযোগসাতক্ষীরা জেলা সাংবাদিক ফোরাম (রেজিঃ নং-৫৮৩/০৪)-এর সভাপতি মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, গুড়পুকুর মেলা সাতক্ষীরার মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দুই বছর মেলা বন্ধ থাকায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। এবার মেলা শুরু হওয়ায় সেই শূন্যতা অনেকটাই পূরণ হয়েছে।তিনি বলেন, মেলাকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও উপকৃত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে এসে মিলিত হচ্ছেন। ফলে এটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল বলেন, গুড়পুকুর মেলার সঙ্গে সাতক্ষীরার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একসময় মেলা ছিল গ্রামীণ ও শহুরে মানুষের মিলন, বিনোদন এবং পণ্য কেনাবেচার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই ধারাবাহিকতায় গুড়পুকুর মেলা আজও মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।তিনি বলেন,অনেকেই ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে মেলায় আসার স্মৃতি এখনও ধরে রেখেছেন। দুই বছর মেলা বন্ধ থাকায় সেই পরিচিত উৎসব থেকে বঞ্চিত ছিলেন তারা। এবার মেলা ফিরে আসায় পুরোনো স্মৃতিও যেন নতুন করে ফিরে এসেছে।সন্ধ্যার পর গুড়পুকুরপাড়ের বটতলা এলাকায় বাড়ছে মানুষের উপস্থিতি। আলো, দোকানপাট, শিশুদের কোলাহল আর দর্শনার্থীদের ভিড়ে তৈরি হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত মেলা চলবে। মেলার সার্বিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।দুই বছর বিরতির পর ফিরে আসা তিনশ বছরের গুড়পুকুর মেলা তাই এবার শুধু একটি আয়োজন নয়—এটি সাতক্ষীরার মানুষের পুরোনো স্মৃতি, লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত