প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
স্টেশনের ৭ নং পার্কিংয়ে জামাই-বউ-শাশুড়ির রমরমা ইয়াবার হাট
সংবাদ দিগন্ত ||
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের উত্তর পাশের ৭ নম্বর বাস পার্কিং। প্রতিদিন ট্রেনযাত্রী, পরিবহনশ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পথচারীর ভিড়ে সরগরম থাকে এলাকাটি। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই পরিবহনকেন্দ্রের পাশের জনাকীর্ণ স্থানটিকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ও গাঁজার খুচরা বেচাকেনা এবং মাদকসেবীদের আনাগোনার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বিষয়টি কয়েকজন বিচ্ছিন্ন বিক্রেতার কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। দৃশ্যমানভাবে কিছু নারী-পুরুষ মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকলেও তাদের পেছনে মাদক সরবরাহ, অর্থ সংগ্রহ এবং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আরও বড় একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে তাদের সন্দেহ।সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো কোনো একজন বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলে, এলাকা ছাড়লে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়লে দ্রুত তার জায়গায় অন্য কাউকে বসানো হয়।তবে অভিযোগ সত্য হলে ৭ নম্বর পার্কিংয়ের সমস্যাটি কেবল কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে আটকের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়; বরং এর পেছনের সরবরাহ ও আর্থিক কাঠামো খুঁজে বের করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।অনুসন্ধানে কথা বলা স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, রেলওয়ের সীমানার ভেতরে পার্কিং এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু অস্থায়ী বা টংঘর গড়ে উঠেছে। তাদের দাবি, এসব স্থাপনার কয়েকটিকে কেন্দ্র করে দিনের বিভিন্ন সময় মাদকসেবী ও সন্দেহভাজন বিক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যায়।অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যেই গাঁজা ও ইয়াবার কেনাবেচা এবং সেবনের ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি নারী, শিশু ও পরিবার নিয়ে স্টেশন ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।রেলওয়ের জায়গায় এসব স্থাপনার বৈধতা কী, কার অনুমতিতে সেগুলো নির্মিত হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত কী কার্যক্রম চলে এসব প্রশ্নেরও প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।আরও পড়ুন , গঙ্গাচড়ায় দ্বিতীয় উপজেলা কাব ক্যাম্পুরির উদ্বোধন অনুষ্ঠিত৭ নম্বর পার্কিংকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগে মরিয়ম, তাঁর স্বামী আব্দুল্লাহ প্রকাশ মোল্লা এবং মরিয়মের মা নাসিমার নাম উঠে এসেছে। এছাড়াও সূত্রের দাবি এদের প্রত্যেকেই একাধিক মাদক মামলার আসামি।প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ফুটেজে অভিযুক্ত নাসিমাকে বলতে দেখা যায়, আমার ইয়াবা খুব ভালো সবাই খেতে/কিনতে পারে না।সূত্রগুলোর দাবি, কিছুদিন আগে পার্কিং এলাকা থেকে ইয়াবাসহ মরিয়মকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা আটক করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে মুক্তি পান। জামিনের পরও তাঁকে পুনরায় ওই এলাকায় দেখা যাচ্ছে ও ইয়াবা বিক্রি করছে বলে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি দাবি করেছেন।৭ নম্বর পার্কিংয়ের কথিত মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ে অনুসন্ধানে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয় এখানে মাঠপর্যায়ে একাধিক ব্যক্তিকে প্রস্তুত রাখা হয় বলে স্থানীয়দের ধারণা।তাদের অভিযোগ, কোনো বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলে, পুলিশের নজরদারি বেড়ে গেলে অথবা নির্দিষ্ট কেউ সাময়িকভাবে এলাকা ছেড়ে দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন ব্যক্তি তার জায়গায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ কারণেই বিচ্ছিন্ন অভিযানে কয়েকজন আটক হওয়ার পরও ১/২ ঘণ্টার মধ্যেই একই এলাকায় আবার মাদক বেচাকেনার অভিযোগ শোনা যায়।কারণ, বিক্রেতা বারবার বদলে গেলেও একই স্থানে যদি ব্যবসা সচল থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে মাদক সরবরাহ করছে কে, নতুন বিক্রেতা ঠিক করছে কে, বিক্রির অর্থ কার কাছে পৌঁছাচ্ছে। স্থানীয় একাধিক সূত্র আরও দাবি করেছে, ৭ নম্বর পার্কিংয়ে শুধু স্থানীয় পর্যায়ে খুচরা বিক্রিই হয় না এখান থেকে অন্য এলাকার ছোট বিক্রেতাদের কাছেও ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা থাকতে পারে।আরও পড়ুন, ফুলবাড়ীয়ায় বিশ্ব শিক্ষক দিবসে র্যালি ও আলোচনা সভাইয়াবা বা অন্যান্য মাদক কোথা থেকে আসছে, পার্কিং এলাকায় বা আশপাশে কোথাও মজুত রাখা হচ্ছে কি নাচালান গ্রহণ করছে কারা,বিক্রির অর্থ সংগ্রহ করছে কে,অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের বিক্রেতাদের সঙ্গে মূল সরবরাহকারীদের যোগাযোগ কীভাবে হচ্ছে।স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও সরবরাহের উৎস, অর্থদাতা এবং কথিত নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করার দৃশ্যমান উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে কম। তাদের মতে, একটি কার্যকর মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্য শুধু কতজন খুচরা বিক্রেতাকে আটক করা হয়েছে, সেই সংখ্যায় নির্ধারণ করা যায় না।বরং কোথা থেকে মাদক আসছে, কোন পথে পৌঁছাচ্ছে, কোথায় মজুত হচ্ছে, কার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং বিক্রির টাকা শেষ পর্যন্ত কার কাছে পৌঁছাচ্ছে পুরো চেইনকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে।ঘটনাস্থলটি রেলওয়ে স্টেশনের সীমানাসংলগ্ন হওয়ায় মাদকবিরোধী তৎপরতার পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।স্থানীয়দের দাবি, রেলওয়ের নিরাপত্তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, রেলওয়ে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গাকে ঘিরে এমন অভিযোগ টিকে থাকার সুযোগ কমে আসার কথা।চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিপুলসংখ্যক যাত্রীর প্রবেশ ও প্রস্থানের কেন্দ্র।এমন একটি জনবহুল স্থানের খুব কাছে মাদকের সহজলভ্যতার অভিযোগ তাই শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয় এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদকসেবী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়লে ছিনতাই, চুরি, যাত্রী হয়রানি কিংবা বিশৃঙ্খলার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাতের সময় এবং ট্রেন ছাড়ার আগে-পরে বিপুল যাত্রীর উপস্থিতির সুযোগ কোনো অপরাধীচক্র ব্যবহার করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।আরও পড়ুন, লামায় অবৈধ ইটভাটায় প্রশাসনের অভিযান ১৩টি ইটভাটায় ২৯ লাখ টাকা জরিমানা৭ নম্বর পার্কিংয়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, পার্কিংয়ের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, অস্থায়ী স্থাপনার আশপাশ এবং সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পর্যাপ্তসংখ্যক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন। তবে শুধু ক্যামেরা বসালেই হবে না ফুটেজ যেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষণ ও প্রয়োজনে তদন্তে ব্যবহার করা যায়, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।নিয়মিতভাবে একই ব্যক্তির যাতায়াত, মোটরসাইকেল বা যানবাহনের মাধ্যমে সন্দেহজনক সরবরাহ এবং রাতের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা গেলে মাদক সরবরাহের সম্ভাব্য চেইন শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের (ডিআরএম) মুস্তাফিজুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাঠান। পাশাপাশি রেলওয়ের ভূমিতে অবৈধ স্থাপনা স্থাপনকারীদের মৌখিকভাবে আগামী ০৯/১০/২৬ তারিখ পর্যন্ত মালামাল সরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সময় দেন।এই বিষয়ে কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ জাহেদুল কবির বলেন,"মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।" তিনি আরো বলেন, "অতি দ্রুত মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।"মাদকবিরোধী তৎপরতা কি দৃশ্যমান কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তদন্ত পৌঁছাবে মাদকের উৎস, পরিবহন, মজুত, অর্থের প্রবাহ এবং নেপথ্যের কথিত নিয়ন্ত্রকদের পর্যন্ত। একজন বিক্রেতা চলে যাওয়ার পর যদি আরেকজন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে অভিযান হয়তো ব্যক্তিকে সরায় কিন্তু কাঠামো অক্ষত থেকে যেতে পারে।চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশদ্বারের পাশে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকলে বিচ্ছিন্ন অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর সমন্বিত অনুসন্ধান। মাদকের উৎস থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইন, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের মাধ্যম এবং সুবিধাভোগীদের শনাক্ত না করা পর্যন্ত ৭ নম্বর পার্কিংয়ের কথিত মাদকচক্রের প্রকৃত চিত্র হয়তো আড়ালেই থেকে যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত