প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাসাইলে ১০ কোটি টাকার সেতুতে বাঁশ: প্রকৌশলী বান্দরবান স্ট্যান্ড
হেমায়েত হোসেন হিমু ||
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতেরস্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকেস্ট্যান্ড রিলিজ (তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার) করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-১) মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশেরমাধ্যমে তাকে বাসাইল উপজেলা থেকে বান্দরবান জেলার দুর্গম রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়েদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।অফিস আদেশ বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তাকে তার নামেরপার্শ্বে বর্ণিত পদবি ও কর্মস্থলে স্ব-বেতন স্কেলে বদলি করা হয়েছে। এই কর্মকর্তা আগামী ২৭সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে বদলি করা কর্মস্থলে যোগদান করবেন; অন্যথায়২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন। একইসঙ্গে আর্থিকক্ষমতাসহ উপজেলা প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব (৬ষ্ঠ গ্রেডভুক্ত উপজেলা প্রকৌশলী পদায়ন না করাপর্যন্ত) প্রদান করা হলো। বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান তার স্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টিনিশ্চিত করেন।এদিকে, সেতুতে বাঁশকাণ্ডের ঘটনাটি সারা দেশে বেশ আলোচনার কেন্দুবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দফায় দফায় চলছেতদন্ত। এ ঘটনায় মামলার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এখন পর্যন্ত একজন উপ-সহকারীকে বরখাস্ত ও একই সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশদেওয়া হয়েছে। এরমধ্যেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অভিযানে নেমেছে দুদক। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুদকটাঙ্গাইলের কার্যালয় থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইলজেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বিপ্লব হোসেন।দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বিপ্লব হোসেন বলেন, ‘দুদকের পক্ষ থেকে সেতুটিতেঅভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এখানে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা ফুটপাত স্ল্যাব ওরেলিংয়ের পিলার ভেঙে দেখেছি। এখানে রডের পরিমাণটা কম রয়েছে। রড ততটুকু থাকা দরকার, সেটুকু নেই।সরেজমিনে যে রিপোর্টটি তৈরি করেছি, সেটা আমাদের এক্সপার্ট আছে, ওনারা সরেজমিন প্রতিবেদন দেবে।সেটার ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক সত্যতা পেলে আমরা কমিশনকে বিস্তারিতভাবে জানাবো। তারপর কমিশনথেকে যে নির্দেশনা দেবে আমরা পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করবোআরও পড়ুন, গোপালগঞ্জে প্রতিপক্ষের হামলায় কলেজ ছাত্র নিহত।বাঁশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলো আমরা সরেজমিনে দেখতে পাইনি। তবে মিডিয়ারমাধ্যমে সেগুলো দেখেছি। সেখানে সাটারিং-এ বাঁশের ব্যবহার আমরা দেখেছি।একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানকেসাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহীপ্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে কারণ দর্শানোর(শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক তিনটি অফিসআদেশ ও চিঠির মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদীহয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। মামলায় প্রধান আসামি ঠিকাদার এসএমজাহাঙ্গীর আলম ও অপর আসামি সাব-ঠিকাদার শাহ আলম। সেতুটি পরিদর্শনে আসেন স্থানীয় সরকারপ্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক।ঘটনার তদন্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করাহয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইলপৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারীপ্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে।জানা গেছে, বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর (বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়ামাইজখাড়া জিপিএস সড়ক) ৯০ দশমিক শূন্য ৬ মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয়প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া কাজটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিলচলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে ২০ শতাংশ।স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুরফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে বাধা দিলেকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা মোবাইল ফোনে কাজটির ভিডিও ধারণ করে। স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর আবাররাতে কাজ শুরু করে ঢালাই শেষ করা হয়। পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েপড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর সেতুটি পরিদর্শন করা হয়েছে। এঘটনায় তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন মুঠোফোনে কাজী ফাত্তাউর রহমানেরস্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টি এড়িয়ে যান। এ সময় তিনি শোকজের বিষয়টি স্বীকার করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত