প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গোয়ালপাড়ায় থেমে নেই এরশাদ-মমতাজে'র মাদকের হাট
এম মিজানুর রহমান ||
চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানাধীন ২২ নং এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের গোয়ালপাড়া ও সংলগ্ন তুলাতলী বস্তি দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অন্যতম আলোচিত স্পট হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় এলাকাটির নাম বারবার সামনে এসেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ১/২ ঘন্টা পর পরই আবারো পুনরায় বীরদর্পে মাদক বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গোয়ালপাড়া ও তুলাতলীর মাদক সমস্যা কেবল একটি এলাকার বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয় বরং এটি বৃহত্তর সরবরাহ ও পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। ফলে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই স্থায়ী সমাধান আসবে না।স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গোয়ালপাড়ার আলোচিত মাদক কারবারিদের মধ্যে এরশাদ উল্লা ও তার স্ত্রী মমতাজের নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে এবং তারা একাধিকবার কারাভোগও করেছেন।নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রির পাশাপাশি বস্তির ভেতরে টিনশেডের কয়েকটি ঘরে মাদকসেবনের সুযোগও রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও পড়ুন, সাতক্ষীরায় তৃণমূল সংগঠন সদস্যদের সম্মেলন অনুষ্ঠিতএকই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের মাধ্যমে মাদক বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মমতাজ বেগম বলেন, মাদক ব্যবসা করে তেমন লাভ নেই সবাইকে টাকা দিয়েই ব্যবসা করতে হয়। এখানে আমি ছাড়াও অনেকেই ব্যবসা করে। একা ব্যবসা করতে পারলে ভালো লাভ আছে। এগুলো বাদ দেন "আপনাকে খরচের জন্য মাঝে মাঝে টাকা দেব।"কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জায়েদ নাজমুন নূরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল কিছুদিন পূর্বে গোয়ালপাড়ায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে গাঁজা সহ দুই ব্যক্তিকে আটক করা হলেও পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে এরশাদ ও মমতাজ এর মেয়ের স্বামী মাসুদ পালিয়ে যান বলে এজাহারের ভাষ্য। তবে পুলিশি অভিযানের কিছুক্ষণ পরপরই পুনরায় বীরদর্পে মাদক কারবার চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এজাহারভুক্ত হওয়ার পরও একজন অভিযুক্ত কীভাবে একই এলাকায় মাদক কারবার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন,"দিন-রাত প্রায় সব সময়ই অনেক অপরিচিত মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।" একজন অভিভাবকের ভাষ্য,"আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে কিশোররা।সহজ টাকার লোভে অনেকেই অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে।"একজন রিকশাচালক বলেন,"পুলিশ অভিযান চালালে কিছু সময় শান্ত থাকে।১/২ ঘন্টা পরে আবার আগের মতো হয়ে যায়।" এছাড়াও একজন শিক্ষক বলেন, "মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়।"স্থানীয়দের মতে, অপরাধচক্রে কিশোরদের সম্পৃক্ত করা হলে তারা ভবিষ্যতে সংঘবদ্ধ অপরাধের অংশ হয়ে পড়তে পারে। শিশু ও কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার তাদের শিক্ষা,মানসিক বিকাশ ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।আরও পড়ুন, গোয়ালপাড়া ও আশপাশের এলাকায় মাদকের প্রভাবে স্থানীয়দের মতে, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি, চুরি, ছিনতাই ও সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি, পরিবারে অশান্তি ও অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি,নারীরা ও সাধারণ পথচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন,স্থানীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ও নতুন প্রজন্ম মাদকের সহজ প্রাপ্যতার ঝুঁকিতে রয়েছে।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদকের অর্থের উৎস শনাক্ত করা, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়া, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কিশোরদের পুনর্বাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা।এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।সচেতন নাগরিকদের মতে, গোয়ালপাড়া ও তুলাতলীর মতো আলোচিত এলাকায় ধারাবাহিক ও গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক অভিযান, সন্দেহভাজন অর্থনৈতিক লেনদেনের তদন্ত, কিশোরদের পুনর্বাসন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আইনের শাসন নিশ্চিত করা হলে এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জায়েদ নাজমুন নুর বলেন, "মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। স্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "উক্ত এলাকায় অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।"গোয়ালপাড়া ও তুলাতলীর মাদক সমস্যাকে কেবল একটি বস্তির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জননিরাপত্তা, কিশোরদের ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নগর নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।কোথা থেকে আসে মাদক, কারা দেয় আশ্রয়, কার হাতে যায় মাদকের টাকা এবং অভিযানের পরও কীভাবে সচল থাকে কারবার নথি, তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিয়ে শিগগিরই প্রকাশিত হবে অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত