প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
লালদিয়ায় এপিএম টার্মিনালে বদলাবে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা
এম মিজানুর রহমান ||
কর্ণফুলীর তীরে ছোট্ট লালদিয়া এবার বিশ্ব মেরিটাইম মানচিত্রে নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগে এখানে গড়ে উঠছে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল। ডেনমার্কভিত্তিক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। স্থানীয় অংশীদার হিসেবে থাকছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড।বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী মহলের মতে, লালদিয়া টার্মিনাল কেবল চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয় এটি বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।৩০ আগস্ট রোববার পতেঙ্গা বোট ক্লাবসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রকল্পটির নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হওয়ার কথা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রায় ৫৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে নির্মিত হবে টার্মিনালটি। এর মধ্যে প্রায় ৩২ একরজুড়ে থাকবে মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর জায়গায় তৈরি হবে ট্রাক পার্কিং সুবিধা। প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ধরা হয়েছে প্রায় তিন বছর। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।টার্মিনালে স্থাপন করা হবে ৭টি শিপ-টু-শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজি) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্র্যাক্টর। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর এই অবকাঠামোতে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ও দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।প্রকল্পটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টিইইউএস। ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের এবং প্রায় ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা থাকবে।আরও পড়ুন, মাভাবিপ্রবিতে ৩ হাজার গাছ রোপণের কার্যক্রম শুরুলালদিয়া টার্মিনালে এপিএম টার্মিনালসের সরাসরি বিনিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাফা, শিপিং এজেন্ট ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মধ্যেও প্রকল্পটি ঘিরে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে লালদিয়া টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং তৈরি করবে।তিনি বলেন, পিসিটি নির্মাণের পর সেটি পরিচালনার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হলেও লালদিয়ার ক্ষেত্রে এপিএম টার্মিনালস নিজস্ব বিনিয়োগে অবকাঠামো গড়ে তুলছে। এতে বাংলাদেশের বন্দর খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের এই প্রকল্পে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, লালদিয়া টার্মিনালে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। টার্মিনালের ক্রেনগুলো দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিচালনার ব্যবস্থা থাকবে। ফলে পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিক ও কর্মীদের নিরাপত্তাও বাড়বে।লালদিয়া প্রকল্পে শুধু প্রযুক্তি ও অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বন্দর খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষপ্রধান বন্দর কর্মপরিবেশে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।আরও পড়ুন,মেলা আয়োজন নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, গঙ্গাচড়ায় কৃষক দল নেতার সংবাদ সম্মেলন৩০ আগস্ট পতেঙ্গা বোট ক্লাবসংলগ্ন কর্ণফুলীর তীরে লালদিয়া টার্মিনালের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা রয়েছে। নৌপরিবহন, সড়ক ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি সম্প্রতি এ প্রকল্পকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন টার্মিনাল হিসেবে গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন।১৩ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এপিএম টার্মিনালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মানের এই টার্মিনাল বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি সম্প্রসারণ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যত বাড়ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্দর অবকাঠামোকেও আধুনিক ও দক্ষ করে গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগাতে সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় নতুন সক্ষমতা যুক্ত হবে। বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ, দ্রুত কনটেইনার হ্যান্ডলিং, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব পরিচালন ব্যবস্থা চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক বন্দর প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থানে নিতে পারে।ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা, লালদিয়াকে ঘিরে ভবিষ্যতে শিপিং কোম্পানি, আমদানি-রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ মেরিটাইম খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও বাড়বে। ফলে কর্ণফুলীর তীরের এই ছোট্ট লালদিয়া শুধু একটি টার্মিনালের ঠিকানা নয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে।সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, লালদিয়া টার্মিনাল হবে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি গেম চেঞ্জার যার প্রভাব শুধু বন্দরে সীমাবদ্ধ থাকবে না ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশের পুরো বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত