প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
অভিযানেও অধরা ‘কমলা’ এখনো বীরদর্পে মাদক কারবারের অভিযোগে জনমনে ক্ষোভ
এম মিজানুর রহমান ||
চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন ২২ নং এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের গোয়ালপাড়া ও সংলগ্ন তুলাতলী বস্তিতে সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ১ কেজি ৫০ গ্রাম গাঁজাসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কমলা নামে এক অভিযুক্ত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে ও মামলায় তাকে ৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মামলার এজাহারে নাম আসার পরও কমলার বিরুদ্ধে এখনো এলাকায় বীরদর্পে মাদক কারবার চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জায়েদ নাজমুন নূরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সম্প্রতি গোয়ালপাড়ায় ওই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হলেও পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে কমলা পালিয়ে যান বলে এজাহারের ভাষ্য। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এজাহারভুক্ত হওয়ার পরও একজন অভিযুক্ত কীভাবে একই এলাকায় মাদক কারবার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে, গেল ৪/৫ মাস পূর্বে কমলার মাদক স্পটে মাদক উদ্ধারের অভিযান পরিচালনা করতে এসে কোতোয়ালি থানার পুলিশ কমলা ও তার ছেলে ইয়াসিনসহ তাদের নিয়ন্ত্রিত বাহিনী কর্তৃক হামলার শিকার হয়ে আহত হন এএস আই মনির। উক্ত হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে কমলা ও তার ছেলে ইয়াসিনকে আসামি করে একটি মামলাও দায়ের করা হয়।আরও পড়ুন, সিলেট বাস দুর্ঘটনা: নিহতদের পরিবারকে ৫ লাখ অনুদানগোয়ালপাড়া ও তুলাতলী বস্তি দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কেনাবেচার অভিযোগে আলোচিত। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার এবং ইয়াবা-গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় এই এলাকার নাম সামনে এসেছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান চালানোর পর কিছু সময় মাদক বেচাকেনা বন্ধ থাকলেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক রিকশাচালক বলেন, “পুলিশ অভিযান চালালে কিছু সময় শান্ত থাকে। এক-দুই ঘণ্টা পর আবার আগের মতো হয়ে যায়।”স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা ও আশ্রয়দাতাদেরও শনাক্তের পাশাপাশি আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গোয়ালপাড়ায় মাদক কারবারের অভিযোগে কমলার নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তার বিরুদ্ধে ১০টির বেশি মামলা রয়েছে এবং তিনি একাধিকবার কারাভোগ করেছেন বলেও সূত্রগুলোর দাবি। তবে এসব মামলার সংখ্যা, বর্তমান অবস্থা এবং বিচারিক ফলাফল প্রতিবেদকের পক্ষে স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আরও পড়ুন, রংপুরে ট্রেনের ইঞ্জিন ও বগি লাইনচ্যুত, দেড় ঘণ্টা পর স্বাভাবিক রেল চলাচলগোয়ালপাড়া-তুলাতলীর পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে কিশোরদের মাদক কারবারে ব্যবহারের অভিযোগ। একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রির পাশাপাশি বস্তির ভেতরে টিনশেডের কয়েকটি ঘরে মাদকসেবনের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের দিয়ে মাদক বিক্রি করানোর অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবেদকের কাছে থাকা একটি ভিডিও ফুটেজে একটি ঘরের সামনে দুই কিশোরকে পলিথিনে মোড়ানো গাঁজা- ইয়াবাসদৃশ ট্যাবলেট নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়। স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় কিশোরদের নিয়ে। সহজ টাকার লোভে অনেকেই অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে।” পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “দিন-রাত প্রায় সব সময়ই অনেক অপরিচিত মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।” এছাড়াও একজন শিক্ষক বলেন, “মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়।”স্থানীয় সচেতন মহলের ধারণা, গোয়ালপাড়া ও তুলাতলীর মাদক সমস্যা শুধু কয়েকজন খুচরা বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। এর পেছনে বৃহত্তর সরবরাহব্যবস্থা বা পাচার নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জায়েদ নাজমুন নুর বলেন, "মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। স্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "উক্ত এলাকায় অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।"আরও পড়ুন, বিয়ের আনন্দ পরিণত হলো সংঘর্ষে, খাবার পরিবেশন নিয়ে হাতাহাতি আহত ৩নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙা, অর্থের উৎস অনুসন্ধান, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং মাদক কারবারে কিশোরদের ব্যবহার করা হলে তাদের শনাক্ত ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন।এ বিষয়ে কমলার সাথে মুঠোফোনে একাধিক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি তবে তার ছেলে পরিচয় দিয়ে মুঠোফোনে ইয়াসিন নামক এক ব্যক্তি জানান এই এলাকায় তো অনেকেই ব্যবসা করে। উল্লেখ্য যে কমলার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।গোয়ালপাড়া ও তুলাতলীর মাদক পরিস্থিতিকে শুধু একটি এলাকার বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিশোরদের ভবিষ্যৎ, জননিরাপত্তা, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এবং নগরের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা।বিশেষ করে পুলিশের এজাহারে মাদক মামলার ৪ নম্বর আসামি এবং পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকার পরও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক কারবার অব্যাহত রাখার অভিযোগ ওঠা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে নতুন প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।কোথা থেকে আসে মাদক, কারা দেয় আশ্রয়, কার হাতে যায় মাদকের টাকা এবং অভিযানের পরও কীভাবে সচল থাকে কারবার নথি, তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিয়ে শিগগিরই প্রকাশিত হবে ‘সংবাদ দিগন্ত’ এর অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত