প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ আগস্ট ২০২৬
সুরক্ষা শুধু বইয়ের পাতায়, কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর মিছিলে আর কত প্রাণ
মোঃ রাকিব হোসেন ||
বাংলাদেশে শ্রম আইন, শ্রম বিধিমালা এবং জাতীয় বিল্ডিং কোডের মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশের সিংহভাগ কর্মক্ষেত্রে সাধারণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি এখনো চরমভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। কাগজে-কলমে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর যে কড়াকড়ি দেখা যায়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে তার ফারাক আকাশ-পাতাল। এই কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আইন অমান্যের সংস্কৃতির কারণে সাধারণ শ্রমিকের জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন স্বাধীন মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলোতে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিআইএলএস) এবং ওশি (OSHE) ফাউন্ডেশনের সংগৃহীত যৌথ তথ্যমতে, বিগত ২০২৫ সালেই দেশের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১,১৯০ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন, যা তার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। একই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যেই শুধু কর্মক্ষেত্রে অসতর্কতা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক। এই পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যা নয়, বরং দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের আড়ালে থাকা শ্রম খাতের এক ভয়াবহ, রক্তক্ষয়ী ও গভীর উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তোলে।আরও পড়ুন, নরসিংদীতে আওয়ামীলীগ নেতার লাঠির আঘাতে বিএনপি নেতা নিহতআইনি বইয়ের পাতা উল্টালে দেখা যায়, প্রতিটি বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য মালিকপক্ষ বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিকদের হেলমেট, সেফটি বেল্ট, গগলস ও বুট জুতোর মতো ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী বা পিপিই (PPE) সরবরাহ করবে এবং শ্রমিকরা তা পরিধান করছে কিনা তা তদারকি করবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নির্মম। বিশেষ করে দেশের দ্রুত বর্ধনশীল নির্মাণ খাত ও সাধারণ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে শ্রমিকদের কোনো রকম সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য করা হয়। বহুতল ভবনের ওপর নড়বড়ে বাঁশের মাচায় দাঁড়িয়ে, খালি পায়ে বা স্যান্ডেল পরে, কোনো রকম সেফটি বেল্ট বা সেফটি নেট ছাড়াই শ্রমিকদের রড বাঁধার বা প্লাস্টারিংয়ের কাজ করতে দেখা যায়। এই বিষয়ে মালিকপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা অনেক সময় খরচ বাঁচানোর অনৈতিক অজুহাত দাঁড় করান, অথবা শ্রমিকরা এসব ভারী জিনিস পরে কাজ করতে অভ্যস্ত নয় কিংবা গরমে কষ্ট হয়—এমন অত্যন্ত ঠুনকো ও দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। একইভাবে, বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী যেসব প্রতিষ্ঠানে ৫০ জনের বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন, সেখানে মালিক ও শ্রমিকদের সমপরিমাণ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাধ্যতামূলকভাবে একটি 'সেইফটি কমিটি' গঠনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই কমিটির কাজ হওয়ার কথা কর্মস্থলের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা নিরসন করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক ক্রেতাগোষ্ঠী ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর তীব্র চাপের কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বা আরএমজি (RMG) খাতের কিছু কারখানায় এই কমিটি গঠনে কিছুটা অগ্রগতি হলেও, এর বাইরের ভারী শিল্প, জাহাজ ভাঙা শিল্প, চাল কল এবং বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল খাতে কোনো কার্যকর সেইফটি কমিটির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। আর যেসব কারখানায় নামমাত্র কমিটি খাতা-কলমে দেখানো হয়েছে, সেখানেও মালিকপক্ষের একচ্ছত্র প্রভাব ও ভীতি প্রদর্শনের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে কথা বলার বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের বিরুদ্ধে দাবি তোলার মতো কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে না।আরও পড়ুন, গাইবান্ধায় রাতের ঘটনাকে ঘিরে আলোচনা, অভিযোগ অস্বীকার করলেন ছাত্রনেতাএই দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার পেছনে রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থাগুলোর চরম নিষ্ক্রিয়তা, জনবল সংকট ও জবাবদিহিতার অভাব অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। দেশের আইন অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বা ডাইফ (DIFE) প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত আকস্মিক তদারকি করার, সেফটি অডিট করার এবং ত্রুটিপূর্ণ বা নিয়মভঙ্গকারী কারখানার লাইসেন্স বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তীব্র পরিদর্শক সংকট এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে হাজার হাজার কারখানা বছরের পর বছর কোনো রকম সরকারি পরিদর্শন ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার নামমাত্র পরিদর্শনের মাধ্যমে বা টেবিল অডিটের মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ ও বিপজ্জনক ভবন বা কারখানাকে অর্থের বিনিময়ে বা রাজনৈতিক প্রভাবে সেফটি ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, কর্মক্ষেত্রে মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৮৪ শতাংশই ঘটে অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল সেক্টরে, যেখানে সরকারের কোনো প্রকার নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ একেবারেই পৌঁছায় না। দিনমজুর, রিকশাচালক, ইটভাটা শ্রমিক বা ছোট ওয়ার্কশপের কর্মীরা এই বৃত্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। নির্মাণাধীন ভবনে ওপর থেকে হুট করে পড়ে যাওয়া, ভারী বা শক্ত বস্তুর আঘাত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, কারখানার রাসায়নিক ও ধোঁয়ায় ফুসফুস নষ্ট হওয়া এবং সেপটিক ট্যাংক বা গভীর কূপের বিষাক্ত গ্যাসে দম আটকে প্রায়শই অবহেলাজনিত কারণে শ্রমিকের করুণ মৃত্যু হচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব দুর্ঘটনার পর মালিকপক্ষ অনেক সময় আইনি ও আর্থিক দায় এড়াতে আহত বা নিহত শ্রমিককে নিজেদের নিয়মিত কর্মচারী হিসেবেই স্বীকার করতে চায় না এবং তাদের পরিবারকে নামমাত্র কিছু টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করে।আরও পড়ুন, জরুরি রক্ষণাবেক্ষণে গোপালগঞ্জের একাধিক এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধশ্রমিক অধিকার সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা এবং অর্থনীতিবিদরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন যে, বাংলাদেশে চমৎকার সব আন্তর্জাতিক মানের আইনের কোনো অভাব নেই, অভাব শুধু এর শতভাগ কার্যকর প্রয়োগ এবং মালিক ও প্রশাসনের সদিচ্ছার। শ্রম আইনে দুর্ঘটনার জন্য যে নামমাত্র জরিমানার বিধান রয়েছে, তা বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এতটাই সামান্য যে মালিকপক্ষ অর্থদণ্ডকে ভয় পাওয়ার চেয়ে আইন অমান্য করাকেই বেশি লাভজনক মনে করে। এই দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং আইনি ফাঁকফোকরের কারণে বড় বড় দুর্ঘটনার পরও প্রভাবশালী মালিকরা সহজে পার পেয়ে যান, যার ফলে দেশের শিল্প খাতে আজও একটি টেকসই 'নিরাপত্তা সংস্কৃতি' (Safety Culture) গড়ে ওঠেনি। শ্রমিকদের অমূল্য জীবন বাঁচাতে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ও রপ্তানি অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে এখন সময় এসেছে শুধু কাগজী নীতিমালায় সীমাবদ্ধ না থাকার। অনতিবিলম্বে দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা, ডাইফ-এর পরিদর্শকদের সংখ্যা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং আইন অমান্যকারী ও অবহেলাকারী মালিকদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায়, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন এবং একটি উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন কেবল দূরবর্তী স্বপ্নই থেকে যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত