প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
প্রকৃতির নির্মম ছোবলে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৩ প্রাণহানিসহ দুর্যোগের মুখে প্রায় ৯ লাখ মানুষ
এম মিজানুর রহমান , ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম ||
চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং একের পর এক পাহাড়ধসে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ মানবিক সংকট। বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে, বহু গ্রাম ও জনপদ বিচ্ছিন্ন, হাজারো পরিবার গৃহহীন এবং কৃষি, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চললেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই পাঁচ জেলায় চলমান দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা পৌঁছেছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জনে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় দুর্যোগের চিত্র তুলে ধরছে।পাঁচ জেলার মধ্যে প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজার। সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন, যাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন ১১ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জন। আহতদের মধ্যে কক্সবাজারে ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে ২ জন এবং খাগড়াছড়িতে ১ জন রয়েছেন।জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম জেলা। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৬২ হাজার ছাড়িয়েছে। কক্সবাজারে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজারের বেশি, বান্দরবানে ৮ হাজারের বেশি এবং রাঙামাটিতে প্রায় ৪ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন।বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি থেকে মানুষকে নিরাপদে রাখতে পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৫৫ জন নারী, পুরুষ ও শিশু অবস্থান করছেন।আরও পড়ুল, চরফ্যাশনে এইচএসসি কেন্দ্রে হামলা: নকল করতে না পেরে ভাঙচুর, মামলা চট্টগ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন ২২ হাজার ৬০০ জন, বান্দরবানে ৪ হাজার ৭৪৫ জন, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৮২০ জন, কক্সবাজারে ২ হাজার ৯৭৪ জন এবং খাগড়াছড়িতে ২ হাজার ৯১৬ জন।দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা যৌথভাবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এখন পর্যন্ত পাঁচ জেলায় ১ হাজার ৯১ দশমিক ৬ মেট্রিক টন চাল, ৯১ দশমিক ১ লাখ টাকা এবং ৩৪ হাজার ৪৭০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।এছাড়া রান্না করা খাবার, শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্য, ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়মিত দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও উন্নয়ন সংস্থাও ত্রাণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।প্রশাসনের তথ্যমতে, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনায় পাঁচ জেলাতেই পর্যাপ্ত চাল, নগদ অর্থ, শুকনো খাবার ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী মজুদ রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।অতিবৃষ্টি ও বন্যার পানি দীর্ঘসময় জমে থাকায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রায় ১৮ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান। পাশাপাশি আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজি, পান বরজ, আদা, হলুদ এবং অন্যান্য অর্থকরী ফসলও ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে।চট্টগ্রাম জেলায় সর্বোচ্চ কৃষি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও হাজারো কৃষক উৎপাদন হারিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। প্রবল বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে জাতীয়, আরও পড়ুন, ৫ দিন পর কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু, স্বস্তি ফিরল রেলপথেআঞ্চলিক এবং জেলা সড়কের বিস্তীর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ২৪১ কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক ক্ষতির শিকার হয়েছে।প্রাথমিক সংস্কারে প্রায় ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং স্থায়ী পুনর্নির্মাণে ২১০ কোটিরও বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের প্রাথমিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা রেল চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের একটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ওই রুটে ট্রেন চলাচল আপাতত বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজ শেষ হলে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। উদ্ধার, বিদ্যুৎ সরবরাহ, ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে একাধিক জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসনকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এজন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের তালিকা প্রস্তুত করে পুনর্বাসন ও সহায়তা কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।চট্টগ্রাম বিভাগের সাম্প্রতিক এই দুর্যোগ শুধু প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এটি কৃষি, অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের জীবিকা সব ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলেছে। লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে। তাই তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি টেকসই পুনর্বাসন, পাহাড় ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত