প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
মিঠাপুকুরে কলেজছাত্রী খুশির রহস্যমৃত্যু, হত্যা ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের অভিযোগে চাঞ্চল্য
মোত্তাছিন বিল্লাহ , মিঠাপুকুর(রংপুর), প্রতিনিধি ||
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রামরায়েরপাড়া এলাকার দ্বাদশ শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী কুলসুমা আক্তার খুশীর (১৮) রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে বেরিয়ে এসেছে এক পরিকল্পিত ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য।১৮ জুন দা/লাল লিপির বাড়িতে মিনিকিট প্রয়োগ, অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু; ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসীপ্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে অপমৃত্যু বা UD (Unnatural Death) মামলা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নতুন ডিজিটাল আলামত, নিখুঁত টাইমলাইন, কল হিস্ট্রি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ প্রমাণ করে যে, এটি একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক নরহত্যা ও জোরপূর্বক গর্ভপাতজনিত মৃত্যুর ঘটনা।অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নতুন এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্য অনুযায়ী, খুশি গর্ভবতী (প্রেগনেন্ট) হয়ে পড়লে এক পর্যায়ে মূল অভিযুক্ত মো: মারুফ বিল্লাহ (২৩) তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে শুরু করে। তাদের উদ্ধারকৃত মোবাইল চ্যাট হিস্ট্রি ও ডিজিটাল আলামত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, খুশি তার মাতৃত্বের অধিকার ও সামাজিক স্বীকৃতির দাবি জানালে মারুফ তা প্রত্যাখ্যান করে এবং উল্টো মেয়েটিকে মানসিক চাপ দিতে থাকে।ঘটনার লোমহর্ষক দিনটির (১৮ জুন) নিখুঁত বিবরণ পাওয়া গেছে। জানা যায়, গত ১৮ জুন মূল অভিযুক্ত মো: মারুফ বিল্লাহ (২৩) ও তার সহযোগীরা খুশীকে ফুসলিয়ে মিঠাপুকুরের চিহ্নিত দালাল লিপির বাড়িতে নিয়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে সুমন ও আরাফাত নামে দুই যুবক অভিযুক্ত মারুফের বাড়িতে গিয়েছিলেন। বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীর বড় বোন সালমা বেগম। সেখানে লিপি ও মারুফ মিলে খুশীর শরীরে অননুমোদিত গর্ভপাত করানোর মেডিসিন 'মিনিকিট' (Minikit) প্রয়োগ করে। মিনিকিট সেবনের পরপরই খুশীর জরায়ুতে তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রেমিক মারুফ তাকে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও অভ্যন্তরীণ বিষক্রিয়ার কারণে খুশীর অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে জরুরি ভিত্তিতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। পরবর্তীতে রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে খুশী।আরও পড়ুন, মাদারগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নাজিমুদ্দিন বাবু ফকির নামের এক যুবকের মৃত্যুমিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত স্টাফ শহিদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, ঘটনার দিন রহস্যময়ী দালাল লিপিকেও ওই মেডিকেল প্রাঙ্গণে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। তবে ঘটনার পর অপরাধের গভীরতা টের পেয়ে মূল অভিযুক্ত মারুফের পাশাপাশি দালাল লিপিও সেদিন থেকে সম্পূর্ণ পলাতক রয়েছে। লিপি ও মারুফ সহ এই চক্রের প্রত্যেকেই বর্তমানে গা ঢাকা দিয়েছে।ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে মারুফের গিরাই দক্ষিনপাড়ার বাসায় গেলে তার মা রিক্তা বেগমও ছেলের সন্ধান দিতে পারেননি। তবে ওই এলাকার স্থানীয় দোকানদার সুমন জানান, "মারুফ মাঝে মাঝে তার দোকানে আসত এবং মারুফ নিজের মুখে সুমনের কাছে স্বীকার করেছিল যে খুশীর সাথে তার গভীর প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে।" খুশির মোবাইল ফোন থেকে তাদের গভীর সম্পর্কের অসংখ্য ছবি ও চ্যাট হিস্ট্রিও উদ্ধার করা হয়েছে।অনুসন্ধানে মারুফের চরিত্র ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে আরও কিছু বিস্ফোরক তথ্য মিলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কোচিং শিক্ষক প্রতিবেদককে জানান, মারুফ মূলত একটি নকল সিন্ডিকেটের ওস্তাদ এবং তার মূল ব্যবসাই এটি। শুধু তাই নয়, তার চরিত্র অত্যন্ত কলুষিত এবং সে প্রতি ব্যাচের সুন্দরী ছাত্রীদের টার্গেট করে প্রেমের ফাঁদে ফেলত। খুশিও তার এই সুনির্দিষ্ট ব্ল্যাকমেইলিং ও নোংরা লালসার শিকার হয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।প্রাপ্ত নতুন এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্য অনুযায়ী, মারুফের বড় ভাই মো: মিল্লাদুন (২৭) এই অপরাধের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী। চ্যাট লিস্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মিল্লাদুন মেয়েটিকে বিয়ের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আসছিল এবং তার মানসিক চাপ বা "টেনশন" কমানোর অজুহাতে চিকিৎসকের কোনো পরামর্শ ছাড়াই 'Frenxit' (ফ্রেঙ্কসিট) নামক মনোদৈহিক ওষুধ সাজেস্ট করতো ও নিয়মিত খাওয়াতো। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিষপ্রয়োগের সমতুল্য অপরাধ।এদিকে ঘটনার দিন খুশীর বান্ধবী বৃষ্টির সাথে মুঠোফোনে কথা বলেই খুশী বাড়ি থেকে বের হন। খুশীর কল হিস্ট্রি অনুযায়ী সে সেদিন বৃষ্টিকে ৩ বার কল দিয়েছিল। এই বিষয়ে বৃষ্টিকে প্রশ্ন করা হলে সে বলে, "খুশী নিজেই কল দিয়ে রিকোয়েস্ট করে বলে লাউডে কথা বলতে, যা শুনে খুশী বাইরে যেতে পারে। তাদের প্রেমের সম্পর্কের ব্যাপারে আমার জানা নেই।"আরও পড়ুন, মাদারীপুরে ৩০ মামলার পলাতক আসামি গ্রেপ্তার, উদ্ধার ৪০০ পিস ইয়াবা ও চাপাতিভুক্তভোগী পরিবারের দাবি অনুযায়ী, মারুফের বন্ধু রাকিব ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত মারুফকে এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহায়তা করেছে। তবে এ বিষয়ে রাকিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে সে দাবি করে, ২০১৯ সাল থেকে মারুফের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।" যদিও ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী এই দাবিকে সম্পূর্ণ সাজানো বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।অন্যদিকে, ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত মারুফের বড় ভাই মিল্লাদুন-এর বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার একাধিক ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সবকটি নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।বর্তমানে মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ হিসেবে 'Drug poisoning' বা বিষক্রিয়ার কথা বলা হলেও, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও নিষিদ্ধ ড্রাগের প্রভাবেই এই মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই জান্নাত জানান, "লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ভিসেরা ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট আসলে মৃত্যুর প্রকৃত ও আইনি কারণ সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে। বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।"এই নির্মম ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে খুশীর মা মােছাঃ পারভীন (৪২) বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন, "আমার মেয়েটাকে বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন আর ব্ল্যাকমেইল করে, ১৮ জুন লিপির বাসায় নিয়ে জোর কর মিনিকিট আর ওষুধ খাইয়ে ওরা শেষ করে দিল। মারুফ, তার বড় ভাই মিল্লাদুন, দালাল লিপি আর বান্ধবী বৃষ্টি মিলে আমার কোল খালি করেছে। আমি প্রশাসনের কাছে হাত জোড় করে বিচার চাই- এই অপমৃত্যুর ছক ভেঙে এটিকে যেন দ্রুত নিয়মিত হত্যা মামলা হিসেবে গণ্য করে মারুফ ও লিপি সহ সকল খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় এবং ফাসি দিয়ে আমার ময়ের আত্মার শান্তি নিশ্চিত করা হয়।" খুশীর মায়ের এই বুকফাটা কান্নায় মিঠাপুকুর ও রামরায়েরপাড়া এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে এবং এলাকাবাসী অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত