প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
এক নারীর সাহসে বদলে গেল একটি গ্রাম, স্বাবলম্বী হচ্ছেন শতাধিক নারী
সরকার রফিকুল ইসলাম আরমান, স্টাফ রিপোর্টার কিশোরগঞ্জ: ||
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ধুলজুরী গ্রাম। কয়েক বছর আগেও এ গ্রামের অধিকাংশ নারী ছিলেন পুরোপুরি পরিবারের পুরুষ সদস্যদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের জীবন। সংসারের কাজই ছিল তাদের একমাত্র দায়িত্ব। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। এখন একই গ্রামের অনেক নারী নিজেদের আয় করছেন, পরিবারে অর্থনৈতিক অবদান রাখছেন, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অংশ নিচ্ছেন।এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন নারী উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতি। নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা ও স্থায়ী আয়ের সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ। তার বিশ্বাস—একজন নারী স্বাবলম্বী হলে বদলে যায় একটি পরিবার, আর অসংখ্য পরিবার বদলে গেলে বদলে যায় একটি সমাজ।সেই বিশ্বাস থেকেই ২০২৪ সালে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে মাত্র ১০ জন নারীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন নকশীকাঁথা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা। নিজের বাড়ির একটি ছোট কক্ষে কয়েকজন নারীকে নিয়ে শুরু হয়েছিল নকশীকাঁথা তৈরির প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন কার্যক্রম। শুরুটা ছিল সীমিত, কিন্তু লক্ষ্য ছিল অনেক বড়।মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ এখন একটি বহুমুখী নারী উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৪০ জন নারী সরাসরি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। নকশীকাঁথার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে উদ্যমী মহিলা সমবায় সমিতি লিমিটেড। এছাড়া পাটের পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প, মাশরুম চাষ, মৎস্য চাষসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ।সরেজমিনে ধুলজুরী কমিউনিটি ক্লিনিক সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অনেক বাড়িই এখন ছোট ছোট উৎপাদনকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। কোথাও কয়েকজন নারী একসঙ্গে বসে নকশীকাঁথায় নিখুঁত নকশা ফুটিয়ে তুলছেন। কোথাও তৈরি হচ্ছে পাটের ব্যাগ, শোপিস, ঝুড়ি ও বিভিন্ন হস্তশিল্প। আবার কেউ মাশরুম উৎপাদনে ব্যস্ত, কেউ মাছের খামার পরিচর্যা করছেন।আরও পড়ুন, পাঁচবিবিতে ট্রাক-অটোর মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৫প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কাজ করেই অনেক নারী মাস শেষে সম্মানজনক আয় করছেন। সেই আয় দিয়ে পরিবারের বাজার খরচ, সন্তানদের স্কুলের ফি, চিকিৎসা ব্যয় এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে পরিবারগুলোতে আর্থিক স্বস্তি ফিরে এসেছে।প্রতিষ্ঠানটির সদস্য মাহমুদা আক্তার বলেন, আগে সংসারের কাজের বাইরে তার কোনো পরিচয় ছিল না। প্রতিটি প্রয়োজনেই অন্যের কাছে হাত পাততে হতো। এখন নিজের উপার্জন রয়েছে। পরিবারের ব্যয়ে সহযোগিতা করতে পারছেন, নিজের প্রয়োজনও নিজেই পূরণ করছেন। এতে আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে।আরেক সদস্য ফারিয়া জাহান বলেন, এই উদ্যোগ শুধু তাদের আয় দেয়নি, দিয়েছে আত্মমর্যাদা। আগে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাদের মতামতের তেমন গুরুত্ব ছিল না। এখন পরিবারের সদস্যরা তাদের মতামতকে মূল্য দিচ্ছেন। নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতি বলেন, সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি উপলব্ধি করেন, গ্রামের অসংখ্য নারী দক্ষ হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তাদের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন চাকরি ছেড়ে নারীদের নিয়েই কাজ করবেন।তিনি বলেন, "আমার লক্ষ্য শুধু কয়েকজন নারীকে কাজ দেওয়া নয়। আমি চাই গ্রামের প্রতিটি নারী নিজের পায়ে দাঁড়াক। একজন নারী স্বাবলম্বী হলে তার সন্তান, পরিবার এবং সমাজ—সবাই উপকৃত হয়।"সফলতার পাশাপাশি রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও। উদ্যোক্তা জানান, বর্তমানে নিজের বাড়ির একটি ছোট কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা বাড়লেও প্রশিক্ষণ, পণ্য সংরক্ষণ, সভা ও প্রদর্শনীর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই।তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত অর্থেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। অনেক নারীকে প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনেও ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। সরকারি কিংবা বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আরও অনেক নারীকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনা সম্ভব হবে।আরও পড়ুন, গঙ্গাচড়ায় স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, চ্যাম্পিয়ন ‘মিডিয়া পাওয়ার্স’বর্তমানে ইউনিসেফের সহযোগিতায় শিশুদের জন্য কিছু শিক্ষা ও খেলাধুলার উপকরণ পাওয়া গেলেও নারী উদ্যোক্তাদের সন্তানদের নিরাপদে রাখার জন্য একটি শিশু যত্নকেন্দ্র বা টয় কর্নার নেই। ফলে অনেক নারী কাজ করতে এসে সন্তানদের দেখাশোনা নিয়ে সমস্যায় পড়েন।উদ্যোক্তার স্বামী রুবায়েদ হোসেন রায়হান সাকিব জানান, বর্তমানে প্রায় ৩০ জন নারী মাছ চাষে, ৩০ জন মাশরুম উৎপাদনে এবং শতাধিক নারী নকশীকাঁথা তৈরির কাজে যুক্ত রয়েছেন।তিনি বলেন, শুধু কর্মসংস্থান নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে প্রায় ৫০০টি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে।স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগের ফলে গ্রামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। আগে যেসব নারী পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন, তারা এখন নিজেরাই সংসারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় বহন করছেন। অনেক পরিবারে সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে নারীদের আয় বড় ভূমিকা রাখছে।হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী নাহিদ ইভা বলেন, সামিয়া নাছরিন প্রীতির উদ্যোগটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসার দাবিদার। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। একটি স্থায়ী কার্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা, বাজার সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই মডেল দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণ করা সম্ভব।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে হোসেনপুরের এই উদ্যোগ শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, সারা দেশের নারী উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠবে। গ্রামের নারীদের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক মুক্তির এই যাত্রা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে—এমন আশাই সবার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত